ইতিহাসের অন্যতম ধনী ও দানবীর ‘মানসা মুসা’

যদি জিজ্ঞাসা করা হয় বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি কে? সহসাই চলে আসবে মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের নাম। যার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৩১ বিলিয়ন ডলার। যা বাংলাদেশের তিন বছরের বাজেটের সমান। ওয়ারেন্ট বাফেট কিংবা অ্যামাজন প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস, মার্ক জাকার্বাগের কথা আর নাই বা বললাম। কিন্তু আশ্চর্যের কথা হল, এতসব বিলিনিয়র আর মিলিনিয়রদের পরিচিতি ছাপিয়ে যার নাম ইতিহাসের সর্বকা-ে লর শ্রেষ্ঠ ধনী ও দাতার তালিকায় বারবার উঠে আসে তিনি কে? কী তার পরিচয়? তা জানতেই আজকের লেখা।

ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ধনকুবের হিসেবে যার নাম সবার আগে চলে আসে তিনি হলেন ‘মানসা মুসা’। হালের বিল গেটস, ওয়ারেন্ট বাফেট কিংবা অ্যামাজন প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসসহ সকলের সম্পদ একত্র করলেও তার সম্পদের পরিমাণের ধারে কাছেও হবে না।

মনে হলেও সত্য, মানসা মুসার সম্পদের পরিমাণ ধারণা করাও সম্ভব না। কোনো কোনো গবেষক ধারণা করেন, তার সম্পদের পরিমাণ ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। ২০১২ সালে এক মার্কিন গবেষক দাবি করেন, তার মোট সম্পদ ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার হতে পারে। তাকে সে সময়ের বিশ্ববাসী গুপ্তধন আর স্বর্ণের রাজা হিসেবে চিনত।

মানসা অর্থ রাজা বা সম্রাট। তার জন্ম ১২৮০ সালে এক শাসক পরিবারে। ১৩১২ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি মালি সাম্রাজ্যের রাজা হন। তৎকালীন সময়ে আফ্রিকার দেশগুলো ছিলো খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। এখনো স্বর্ণ আহরণে আফ্রিকার দেশগুলোর জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু আফসোসের কথা হল এ বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ আফ্রিকানরা খুব কমই ভোগ করার অধিকার রাখে। সাম্রাজ্যবাদের দখলদাররা পরোক্ষ উপরিবেশ করে রেখেছে। এ স্বর্ণ মজুদের ফায়দাটা পুরোপুরি ভোগ করে তারা।

২০১৮ এর হিসাব অনুযায়ী জেফ বেজোসের সম্পদের পরিমাণ ১৩১ বিলিয়ন ডলার। ওয়ারেন্ট বাফেটের বিখ্যাত ৮০ বিলিয়ন ডলার। মার্ক জাকার্বাগের প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু অদ্ভুত

মিসরীয় ইতিহাসবিদ আল-উমারি বর্ণনা করেন, মানসা মুসার পূর্বসূরী বড়ভাই দ্বিতীয় আবু বকর মালি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও রাজা ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে পৌঁছা অসম্ভব নয়, সাহস থাকলে ওপারে যাওয়া সম্ভব। একদিন আটলান্টিক মহাসাগরের সীমানা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিলেন। দুই শতাধিক জাহাজ বোঝাই এক বাহিনী প্রেরণ করেন। যাদের সাথে আরো শতাধিক নৌকা ছিল শস্য বোঝাই করে। জাহাজের ক্যাপ্টেনকে তিনি নির্দেশ করেছিলেন, মহাসাগরের শেষ না পাওয়া পর্যন্ত কিংবা মৃত্যু না আসা পর্যন্ত কেউ ফেরত আসতে পারবে না। দু’টির যেকোনো একটি পথ গ্রহণ করতে হবে

এ কাফেলা দীর্ঘদিন পেরিয়ে যাওয়ার পর ফিরে না আসলে রাজা আবু বকর এবার নিজেই আটলান্টিক মহাসাগরের সীমানা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেন। বিশাল কাফেলা নিয়ে সমুদ্রযাত্রার পূর্বে ছোটভাই মানসা মুসাকে নিজের স্থলাি ভষিক্ত করে যান। কয়েক বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও ফিরে না আসলে সকলে নিশ্চিত হয় যে, রাজা আবু বকর আর বেঁচে নেই তবে ইতিহাসবিদরা নিশ্চিত নন যে, রাজা আবু বকর শেষ পর্যন্ত আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে পেরেছিলেন কিনা।

মানসা মুসা মূলত প্রসিদ্ধি লাভ করেন বিশাল বহর নিয়ে হল সফরে বের হলে। তার হজ বহরের কাফেলায় সপূর্ণ থলে বহনকারী ছিল ৬০ হাজার। সাথে ছিল ১২ হাজার দাস-দাসী। যাদের প্রত্যেকের কাছে ছিল স্বর্ণদণ্ড ও একটি সোনার থলে মানসা মুসার রা

তার রাজত্ব বিস্তৃত ছিল প্রায় ২ হাজার মাইলজুড়ে। তার সাম্রাজ্যের বড় অংশ জুড়ে ছিল আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শুরু করে সিনেগাল, গাম্বিয়া, মৌরিত- নিয়া, মালি, বুর্কিনাফাসো, গিনি বিসাও, নাইজার, নাইজেরিয়া, আইভরি কোস্ট-এর বড় অংশসহ আরো ২৪টি শহর ও এর আশপাশের গ্রামাঞ্চল। আফিকাজুড়ে তখন ছিল স্বর্ণের রত্নভাণ্ডার। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের দাবি অনুযায়ী এর অর্ধেকের বেশি স্ব মালিতে। সারাবিশ্বের স্বর্ণ ব্যবসায়ী দের বড় একটি অংশ তখন মানসা মুসার কাছ থেকেই স্বর্ণ সংগ্রহ কর ফলে রাজত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে তার ব্যবসায়িক কার্যক্রমও দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে যেতে থাকল। ফেব্রুয়ারী ২০

সে সময়ের ইউরোপীয় ভূগলবিদরা আফ্রিকার যত মানচিত্র এঁকেছেন তার সবকটিতেই মানসা মুসার নাম পাওয়া যায়। ১৯৩৯ সালে তৈরী এক বিখ্যাত মানচিত্র ইতালির ‘ক্যাটালান আসলাস’। যেখানে পশ্চিম আফ্রিকার মানচিত্রের উপর মানসা মুসাকে একটি স্বর্ণের মানদণ্ড হাতে দেখা যায়। মুসার ঐতিহাসিক হজযাত্রা

হজযাত্রার পূর্বে সারাবিশ্বে মানসা মুসার ছিল না। তেমন পরিচয় ছিল না। স্বর্ণ ব্যবসায়ী হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। কিন্তু বহির্বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন ১৩২৪ বিশাল বহরের হা যাত্রার মধ্য দিয়ে। এ হজযাত্রার জন্য তিনি কয়েক বছর প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বিশাল বহর নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। সাথে আরো ১২ হাজার দাস-দাসী। বিপুল পরিমাণ ধনসম্পত্তির অধিকারি মানসা মুসা যাত্রাপথে হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা দান করেন। এ হজযাত্রায় তার সাথে প্রিয় ঘটান। স্ত্রী ইনারী কোতিও ছিলেন। তার সেবার জন্য নিযুক্ত ছিল ৫০০ দাস-দাসী । যাদের প্রত্যেকের সাথে ছিল এক থলে স্বর্ণমুদ্রা। প্রত্যেকের পায়ে ছিল স্বর্ণখচিত পারস্যের জিজাইনে অস্তিতমূল্যবান জামা। এ বিশাল বহরে ৮০টি উট ছিল, তাদের প্রত্যেকের পিঠে ছিল ৩০০ কেজি সোনা। অধিকাংশ স্বর্ণমুদ্রা তিনি মসজিদ নির্মনে সদকা করে দেন।।

যাত্রাপথে মিসর পৌঁছলে তিনি এতো বেশি অর্থ ও স্বর্ণ সদকা করেন যে, মিসরের স্বর্ণের বাজারে মূল্যস্ফীতি দেখা দেয় এবং অর্থনীতির ধ্বস নামে। এ সময়ে তিনি মিসরে তিনমাস অবস্থান করেন। মার্কিন গবেষকদের ধারণা, এ সময়ে তিনি ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার দান করেন। এর ফলে সেখানকার ব্যবসায়ীদের ১৫০ কোটি ডলার ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। এ কথা জানতে পেরে তিনি একটি বোধিত হন। হজশেষে ফেরার পথে মিসরিয় স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের থেকে উচ্চমূল্যে স্বর্ণ জন্য করেন। দেশটির অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে তিনি ব্যাপক সহযোগিতা করেন। কিন্তু এরপরেও মিসরের স্বর্ণের বাজারে স্থীতিশীলতা ফিরে আসেনি। স্বর্ণের বাজার স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ ১০ বছর লেগে ছিল। রাজা মানসা মুসার হ শেষে দেশে ফিরে যেতে এক বছর সময় লাগে

ইসলাম প্রচারে তার অনবদ্য ভূমিকা

মানসা মুসা শুধু মালি সাম্রাজ্যের রাজা কিংবা স্বর্ণ ব্যবসায়ী হিসেবেই বিখ্যাত নন, একজন মুক্তহস্ত দানবীর হিসেবেও তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। ইসলাম ধর্মের প্রতি ছিলেন একনিষ্প্রাণ। ইসলামের প্রচার-প্রসারে তার মুক্তহস্তে দানের কথাও ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে। আফ্রিকার দেশগুলোতে তার ধর্মচর্চা সম্পর্কে কারো অজানা

মাতৃভাষায় অগাধ পাণ্ডিত্যের সাথে ঘাঁটি আরবী ভাষাতেও তার দক্ষতা ছিল। হজ পালন শেষে ফেরার পথে মক্কা মোকাররমা, কায়রো ও আন্দালুস থেকে অনেক বিশেষজ্ঞ আলেম প্রকৌশলীকে সাথে করে নিয়ে আসেন। তাদের মাধ্যমে আফ্রিকা মহাদেশে প্রচুর সুরম্য মসজিদ, মাদরাসা, লাইব্রেরী ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেন। এবং এর মধ্য দিয়ে ইসলামী শিক্ষার ব্যাপক প্রচার-প্রসার

মানসা মুসার সাথে কায়রো থেকে আসেন বিখ্যাত স্থপতি ইসহাক আল-তেওছেন। তিনি প্রতি মাসে ২০০ কেজি স্বর্ণমুদ্রা পারিশ্রমিক পেতেন। মুসার নির্দেশে তিনিই মালির সর্ববৃহৎ শহর ‘ডিম্বাকভূ’তে দ্য গ্রেট মস্ক অফ ডিম্বাকভু নামে একটি সুরম্য মসজিদ নির্মান করেন। যা আজও প্রত্নতাতিকদের নিকট বিস্ময় হয়ে আছে। মুসলিম বিশ্বকে আকৃষ্ট করার জন্য তিথাকতুতে সানকোর বিশ্ববিদ্যা লয় নামে একটি বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেন।

মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যা লয়ের পর এই সানকোর বিশ্ববিদ্যা শয়ই ছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ বই সংগ্রহশালা। সানকোর ছিল আফ্রিকা দেশগুলোর শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই আফ্রিকায় ইসলামের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ঘটে। রাজত্বের অবসান

মীর্ঘ ২০ বছর মালি সাম্রাজ্যে রাজ করার পর ১৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে ইউরোপীয় অাসন ও গৃহযুদ্ধের কারণে তার বিশাল সাম্রাজ্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এভাবেই কালের মালির বিশাল সাম্রাজ হারিয়ে যায়। রয়ে যায় তার নির্মিত বিখ্যাত ডিম্বাকত্ব , সানোকর বিশ্ববিদ্যালয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *