ঈমানের আলো যখন হৃদয়কে স্পর্শ করে

ছুমামা ইবনে উছাল। নববী পরশে ধন্য এক নাম। জাযিরাতুল আরবের বিখ্যাত অঞ্চল ইয়ামামার অধিপতি। রাসূলের পরশে এসে তার জীবন বদলে যাওয়ার ঘটনাটি আজ পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চাচ্ছি।

‘রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অশ্বারোহী বাহিনীকে নজদ অভিমুখে প্রেরণ করলেন। তাঁরা ইয়ামামা বাসীদের নেতা ছুমামা ইবনে উছালকে বন্দি করে আনলেন।

তাকে তিনদিন পর্যন্ত মসজিদের এক খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই তার পাশ দিয়ে যেতেন তাকে জিজ্ঞাসা করতেন, ছুমামা! তোমার কী ধারণা? আমি তোমার সাথে কেমন আচরণ করব? জবাবে তিনি বলতেন, মুহাম্মদ! আমি আপনার কাছে উত্তম আচরণেরই প্রত্যাশা করি। আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তবে হত্যাযোগ্য ব্যক্তিকেই হত্যা করবেন। আর আমার ওপর অনুগ্রহ করলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপর অনুগ্রহ করা হবে। আর যদি আপনার সম্পদের প্রতি আগ্রহ থাকে, তবে খুলে বলুন, আপনি যা চাইবেন তাই আপনাকে দেয়া হবে। এভাবে একাধিকবার রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার মাঝে কথোপকথন চলতে থাকল।

একপর্যায়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনে করলেন তাকে মুক্ত করে দেয়াই ভালো। তাকে মুক্ত করে দিলেন। এদিকে আল্লাহ তায়ালা তার অপার অনুগ্রহে ছুমামার অন্তরে ঈমানের নূর ঢেলে দিলেন।

ছাড়া পেয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। নিকটবর্তী একটি কূপের কাছে গিয়ে তিনি গোসল করে পবিত্র হলেন এবং কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলেন। এরপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে বললেন- হে মুহাম্মদ! ইতিপূর্বে আমার কাছে আপনার চেহারাই ছিল পৃথিবীর সবচে’ ঘৃণিত।

আর আজ আমার নিকট আপনার চেহারাই পৃথিবীর সবচে’ প্রিয় চেহারা। ইতিপূর্বে আমার কাছে আপনার শহর ছিল সবচে’ অপসন্দনীয়। আজ আমার নিকট আপনার শহরই বেশি পসন্দনী য়। পূর্বে আমার নিকট আপনার দীন ছিল সবচে’ ঘৃণিত। আজ আপনার আনীত দীনই আমার সবচে’ কাঙ্ক্ষিত দীন।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ছুমামা রা. কে ক্ষমার সুসংবাদ দিলেন। সেখানে হযরত উমর রা. উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলে উঠলেন, আল্লাহর কসম, ছুমামা আমার চোখে শূকরের চেয়েও হীন ছিল। এখন আমার কাছে তার মর্যাদা আকাশসম অতঃপর ছুমামা রা. রাসূলকে সম্বোধন করে বললেন, আল্লাহর রাসূল! আপনার ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। আমি মুশরিক থাকা অবস্থায় উমরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলাম, পথিমধ্যে আপনার অশ্বারোহী মুজাহিদ বাহিনী আমাকে বন্দি করে নিয়ে আসে। সুতরাং আমাকে উমরা পূর্ণ করেন। কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে উমরার বিধান শিখিয়ে দিলেন এবং উমরা আদায়ের ব্যবস্থা করে দিলেন

করার সুযোগ করে দিন। তখন রাসূলে ছুমামা রা. রাসূলে কারীমের আদেশে কুরাইশদের ওপর থেকে অবরোধ উঠিয়ে নিলেন। এতদিন যে ইসলাম ও মুসলমানদের

হযরত ছুমামা রা. উমরার উদ্দেশ্যে যখন মক্কায় পৌঁছলেন এবং কুরাইশরা শুনল যে, তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম নিয়ে কথা বলছেন তখন তারা তাঁকে উত্ত্যক্ত করতে লাগল। বলতে লাগল, ছুমামা! তুমি তো কাফের হয়ে গেছ, তোমার পূর্বপুরুষদের দীনকে ছেড়ে দিয়েছ। জবাবে তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, আমি কাফের হইনি; বরং মুসলমান হয়েছি। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশ্বাস করেছি। তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি। সে সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ। ইয়ামামা থেকে একটি শস্যদানাও তোমাদের কাছে আসবে না। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দিলেই

আব্দুল হাকীম মুহাম্মদ

আমি তোমাদেরকে শস্য দিব। হযরত ছুমামা রা. নিজ শহরে ফিরে গেলেন এবং মক্কায় শস্য রপ্তানি বন্ধ করে দিলেন। মক্কার খাদ্যশস্যের বড় একটা যোগান দেয়া হত ইয়ামামা থেকে। ফলে কুরাইশরা দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হল।

মক্কার কাফেররা রাসূলে কারীম সাল্লা ল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে চিঠি লিখল। তারা নবীজীর সাথে আত্মী য়তার দোহাই দিয়ে বলল, নিশ্চয় আপনি আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার আদেশ করেন। আমরা আপনার আত্মীয়। চুমামা খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিয়ে আমাদেরকে এবং আমাদের নারী-শিশুদেরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। আপনি আমাদেরকে রক্ষা করুন। ছুমামাকে চিঠি লিখুন।

দয়ার সাগর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুমামাকে চিঠি লিখলেন। তিনি যেন মক্কার এই বয়কট উঠিয়ে নেন এবং খাদ্যশস্য রপ্তানি জারি করে হেরেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত

শত্রুতায় নিজের জীবনকে ব্যস্ত রেখে ছিল সে আজ রাসূলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সংশ্রবে এসে ইসলাম মুসলমানদের বড় হিতাকাঙ্খী ও সাহায্যকারী হয়ে ঈমানের ছায়াতলে দিনাতিপাত করতে থাকেন। রাযিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আনহুম আজমাঈন।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম-এর যোগ্য ও মহান উত্তরসূরী উলামায়ে কেরামের সংশ্রবে এসে হৃদয়কে ঈমানের আলোকে আলোকিত করে ইসলাম মুসলমানদের প্রকৃত হিতাকাঙ্ক্ষীরূপে জীবনযাপন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *