ওয়াজের নামে কী হচ্ছে এসব!

আমাদের দেশে ওয়াজ মাহফিলের রেওয়াজ চলে আসছে বহুকাল ধরে। বিশেষ করে শীতকালে সারাদেশে মাহফিলের হিড়িক পড়ে। বর্তমানে ওয়াজ মাহফিলের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। শীতকালে গ্রাম-গঞ্জে প্রতি রাতে শত শত মাহফিলের আয়োজন করা হয়। আগে শুধু রাতেই মাহফিল হত, ইদানীং দিনের বেলায়ও বহু মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব মাহফিলে হাজার হাজার লোকের সমাগম হয়। এমনকি কোনো কোনো মাহফিলে লাখো মানুষ অংশ- গ্রহণ করে থাকেন। এসব মাহফিলে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দ্বারা অনুমান করা যায় ইসলামের প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়ছে। নিঃসন্দেহে এটা একটা ইতিবাচক দিক। চারদিকে হতাশ হওয়ার মতো অগণিত খবরের মধ্যে মানুষ ইসলামের দিকে ঝুঁকছে এমন খবর কিছুটা হলেও স্বস্তি দেয়।

তবে ইদানীং ওয়াজ মাহফিলের নামে যা কিছু হচ্ছে তা শুধু অস্বস্তিকরই নয়, দীনদার মুসলমানদের ব্যথিতও করছে। বিশেষ করে বক্তাদের কিছু আচরণ নানাভাবে কলুষিত করছে মাহফিলগুলো। নতুন নতুন বক্তারা চমক সৃষ্টি করার জন্য আবিষ্কার করছেন অভিনব সব পন্থা। তারা নানা কৌশলে শ্রোত- াদের আকর্ষণ করতে গিয়ে এমন কিছু আচরণ কিংবা কথা বলছেন যা খোদ ইসলামকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে। কেউ গান গাচ্ছেন, কেউ অভিনয় করছেন, কেউ হুক্কা কিংবা গাঞ্জা টানার

অঙ্গভঙ্গি দেখাচ্ছেন, কেউ জিকিরের নামে বিকৃত রুচির পরিচয় দিচ্ছেন। কেউ সুরের চমক দেখাচ্ছেন, কেউ হাসি-কৌতুকে শ্রোতা-দর্শকদের মাতিয়ে তুলছেন; কেউ ইংলিশ বলে তাক লাগানোর চেষ্টা করছেন; আবার কেউ নানা বিতর্কিত ও অবাস্তব কথা বলে আলোচনায় আসার সুযোগ খুঁজছেন। এমনকি অশ্লীল কথাবার্তা পর্যন্ত অহরহ চলে আসছে তাদের বয়ানে। মাহফিলের যে ভাবগ দ্বীর্য, এর যে একটা নুরানি আবহ থাকার দরকার সেটা এখনকার মাহফিলগুলোতে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

সম্প্রতি আবার বক্তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে রীতিমতো কাদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত হয়েছেন। একজনের জনপ্রিয়তায় আরেকজন ঈর্ষান্বিত, একজনকে ঘায়েল করতে আরেকজন মরিয়া। একজন আরেকজনকে খোঁচাচ্ছেন, সরাসরি কিংবা আকারে-ইংঙ্গিতে কটূক্তি করছেন, গিবত-কুৎসা রটাচ্ছেন। তাদের ভক্ত-অনুরাগী রা আবার সেটা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করছেন। কার মাহফিলে কত লোক হল, কে হেলিকপ্টারে গেল আর কে রিকশায় গেল, কে কত টাকা নেয়, কে গলাকাটা আর কল্লাকাটা সেটাও চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বক্তার কয়েক ঘণ্টার আলোচনায়ও খুঁজে আমল করার মতো কোনো উপাদান পাচ্ছেন না শ্রোতারা। বাহারি সুর, অঙ্গভঙ্গি কিংবা হাস্যরসে মাহফিল।

মাতিয়ে তুললেও সেখানে শিক্ষণীয় তেমন কিছু পাওয়া যায় না। অনেকটা যাত্রাপালার মতো শ্রোতা-দর্শকদের সাময়িক মাতিয়ে রাখাই যেন ওয়াজ মাহফিলগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন কথাটি শ্রোতাদের উপকারে আসবে, কোন আমলটির প্রতি শ্রোতাদের উদ্বুদ্ধ করবে সেটার চেয়ে এখনকার বক্তাদের টার্গেট থাকে কতটা চমক লাগানো যাবে। কীভাবে মাতালে আগামী বছরের মাহফিলের দাওয়াত চূড়ান্ত হবে; কতটা আকর্ষণ লাগাতে পারলে আশপাশের আরো পাঁচ-দশটা দাওয়াত মিলবে সেই মতলব আঁটেন অনেক বক্তা।

আজকাল সরাসরি মাহফিলে উপস্থিত হয়ে যত লোক বয়ান শুনেন এর চেয়ে বেশি লোক ইউটিউবে শুনেন। কারণ হাতে হাতে মোবাইল, ইন্টারনেটও অনেকটা সহজলভ্য। এমবি খরচ করে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ লোক এখন ইউটিউবে বয়ান শুনে থাকেন। অনেকে গান-বাদ্য না শুনে মোবাইলে ইউটিউব থেকে কথিত আধুনিক বক্তাদের বয়ান শুনেন। ইউটিউবে যেসব বক্তার ওয়াজ সবচেয়ে বেশি চলে তাদের কথাবার্তায় আমল করার মতো উপাদান থাকে। নানা চটকদার কথাবার্তা সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে, ঘটনার উপস্থাপন করে তারা মূলত শ্রোতা-দর্শকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন। আর কিছুসংখ্যক ইউটিউবার কপি-পেস্ট বক্তাদের করে, আলোচনা চটকদার ও ভুয়া শিরোনাম দিয়ে ডিউ বাড়ানোর ধান্দা করে। ফলে ইউটিউবে যারা ওয়াজ শুনেন তাদের একটি বড় অংশ নিছক বিনোদনের জন্য শুনে থাকেন। কোন হুজুর হাসির কী গল্প বললেন, কে কত হাসাতে পারলেন, কাকে কে বাঁশ প্রিয়। দিলেন, কে কার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিলেন এসব শ্রোতা-দর্শকদের নিয়ে সাধারণ প্রায়ই আলোচনা

করতেও দেখা যায় আরেকটি মারাত্মক দিক হল, কোনো কোনো বক্তা মাহফিলে ইসলামকে মনগড়া ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে থাকেন। ধর্মীয় জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে মাহফিল মাতাতে তারা এমন এমন আজগুবি কথা ও ঘটনা উপস্থাপন করেন থাকেন যার কোনো ভিত্তি নেই। ইদানীং কেউ কেউ আবার মাহফিলে প্রশ্নোত্তরের নামে ফতোয়া দেওয়া শুরু করে দিয়েছেন। সেখানে সর্বমহলে স্বীকৃত এবং বহুকাল ধরে প্রচলিত

মাসয়ালা-মাসায়েলের ব্যাপারে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। এতে সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে অস্থিরতা। মাহফিলের যে উদ্দেশ্য মানুষকে দীনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা এবং আমলের সঙ্গে যুক্ত করা সেই উদ্দেশ্য অনেকটাই ব্যাহত কর্মকাণ্ডের কারণে। এসব

শুধু যে একতরফা বক্তাদেরই দোষ এমনটাও নয়। দায় আছে আয়োজক এবং শ্রোতাদেরও আয়োজকরা আজকাল মাহফিলগুলোর সফলতা নির্ণয় করে উপস্থিতির ওপর। কার মাহফিলে লোক বেশি হল সেটা নিয়ে এলাকায় রীতিমতো চর্চা হয়। একটি এলাকায় একাধিক মাহফিল হলে সবার চেষ্টা থাকে উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য এমন কাউকে দাওয়াত দেওয়া যার নাম শুনে লোকের উপস্থিতি বাড়বে। এজন্য ইলম ও আমলের দিক থেকে যোগ্য বক্তার চেয়ে তাদের টার্গেট থাকে কে পাবলিককে বেশি মাতাতে পারবেন। ইলম-আমলের কোনো বালাই না থাকুক পাবলিক মাতানোর মতো যোগ্যতা থাকলেই সেই বক্তা আয়োজকদের কাছে সবচেয়ে বেশি পচন্দের। যারা কুরআন-হাদিসের কমই আলোকে আলোচনা করেন; যাদের বয়ানে জীবন রাঙানোর মতো নানা উপাদান থাকে সেই বক্তারা আয়োজকদের কাছে তেমন পছন্দ নয়। কারণ তাদের কাছে সুরের চমক নেই, পাবলিক মাতানোর কথিত কৌশলও তাদের জানা নেই। শ্রোত ারাও তেমন বক্তাদেরই পছন্দ করে যারা সুর, অঙ্গভঙ্গি আর হাস্যরস দিয়ে মাতাতে পারেন। কয়েক ঘণ্টার আলোচনায় কুরআন-হাদিসের কোনো ধার না ধারুক, আজগুবি গল্প-গুজব বললেই শ্রোতাদের কাছে সেই বক্তা মূলত শ্রোতাদের বিকৃত ও নিম্ন রুচিবোধের কারণেই রাতারাতি গজিয়ে উঠছে কথিত জনপ্রিয় কিছু বক্তা। আর তাদের কারণে কলুষিত হচ্ছে এই শত বছর ধরে যে ওয়াজ মাহফিলগুলো দীনের পাঠশালা হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে সেই মাহফি লগুলো আজ কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীনের বিকৃতির দাঁড়িয়েছে।

দুই.

গ্রাম-বাংলার আবহমান সংস্কৃতিতে ধর্মীয় মাহফিলগুলোর প্রভাব গভীর ভাবে মিশে আছে। মসজিদ-মাদরাসা, সামাজিক সংগঠন কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে আয়োজিত মাহফিলগুলো আমাদের দেশের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে বিশেষ মাত্রার যোগ করেছে। প্রত্যন্ত গ্রামে পর্যন্ত সম্প্রসারিত এসব মাহফিল যুগ যুগ ধরে মুসলিম ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে যেমন অনন্য ভূমিকা পালন করেছে তেমনি দেশীয় সংস্কৃতিতে এর আবেদন কম নয়। যাত্রাপালা, জুয়ার আসর, নাটক ও গানের অনুষ্ঠানের বিপরীতে ওয়াজ মাহফিলগুলো ইতিবাচকতায় সময় ও কালোত্তীর্ণ। মাহফিলগুলোকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে যে আবহ ও আবেদন তৈরি হয় তাতে সামাজিক অনাচার কিছুটা হলেও রোধ করছে। পতনোন্মুখ এই সমাজব্যবস্থায় মাঝে মাঝে ধর্মীয় ও নৈতিকতার কিছু কথা মানুষের কানে পৌঁছিয়ে দেয়ার আয়োজন ও ব্যবস্থাপ- না কোনোক্রমেই খাটো করে দেখার নয়।

এককালে মুজাহিদে আযম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী, মাওলানা আতহার আলী, খতিবে আযম মাওলানা সিদ্দীক আহমদ, ফখরে বাঙ্গাল মাওলানা তাজুল ইসলাম, আমিরে শরিয়ত মাওলানা মোহাম্মাদু- ল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর, শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক, মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিসবাহ (রাহিমাহুমুল্লাহ তাআলা) প্রমুখ উলামায়ে কেরাম গ্রাম-বাংলার মানুষদের দীনের পথে আনতে বাংলার আনাচে-কানাচে মাহফিল করে বেড়িয়েছেন। তাদের মাহফিলগুলোর অভূতপূর্ব প্রভাব এবং অসম্ভব রকম ক্রিয়ার কথা এখনো মুরব্বিদের মুখে মুখে আলোচিত হয়। তাদের প্রতিটি কথাকে এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা হীরকখণ্ডের মতো লুফে নিত। সাদামাটা, সহজ-সরল, লৌকিকতাহীন সে কথাগুলোতে দীনি আবেগ ও স্পৃহার স্ফুরণ ঘটত। তাদের মাহফিলে বসে ফুরফুরে জান্নাতি আবহে মুসলমানেরা বিমুগ্ধ হত দীনদার যেকোনো একটি কথাকেও আমলি রূপ দিলে তা জীবন- চলার জন্য যথেষ্ট হয়ে যেত।

বাস্তবতা হল, তাদের সেই ইখলাস ও লিল্লাহিয়াত আজ আর অবশিষ্ট নেই। পৃথিবীর বাহ্যিক চিত্রটা যেমন আমূল পাল্টে গেছে তেমনি মানুষের ভেতরের ইখলাস ও লিল্লাহিয়াতেরও নিদারুণ ভাটা পড়েছে। এখনকার মানুষেরা বৈষয়িকতার মাঝে নিজেদেরকে এমন- ভাবে নিবিষ্ট করে দিয়েছে যে, নিরেট দীনি বিষয়ে পর্যন্ত এর বাইরে কিছু আমিন।

ফেব্রুয়ারী ‘২০ ইং

ভাবতে পারে না। আজকের মাহফি লগুলোর আয়োজকদের উদ্দেশ্যে যেমন স্বচ্ছতার অভাব তেমনি ওয়ায়েজ বা নসিহতকারীদের অংশ গ্রহণটাও শতভাগ ইখলাসপূর্ণ নয়। বৈষয়িকতার নানা প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে থাকে। আর যারা শ্রোতা-দর্শক তারাও আমলি সেই স্পৃহা নিয়ে মাহফিলগু-ে লাতে হাজির হয় না। কথার গুরুত্বের চেয়ে আজ তাদের কাছে সুর ও ভাবের গুরুত্বটা বেশি। কৃত্রিম সুর ও ভাবের যে অভিনয় হয় এর প্রভাবটা দীর্ঘস্থায়ী না হওয়াটাই স্বাভাবিক। সময় ও কালের অধোগতির এই যুগে এমনটা বিচিত্র কিছু নয়। তবুও সাময়িক যে আবেদন ও স্পৃহাটা জাগ্রত হয় তাকে আরো সুচারু ও প্রভাবময় করা যায় কীভাবে সেটাই এখন ভাববার বিষয়। বর্তমান অবস্থা দেখে অনেকে ওয়াজ মাহফিলগুলোর ফলাফল সম্পর্কে নেতিবাচক ও বিরূপ মন্তব্য করেন। আসলে এটা ঠিক নয়। মাথা কেটে ফেলা মাথাব্যথার মহৌষধ নয়। আমাদের মাহফিলগুলো আগের মতো সুফলদায়ক কেন হচ্ছে না এর কারণ বের করা কঠিন কিছু না। কিছু কিছু কারণ আমাদের সবার কাছে পরিষ্কার। এগুলোর সংশোধন জরুরি। এছাড়া মাহফিলগুলো আরো কীভাবে ফলদায়ক করা যায় সে ব্যাপারে সবার ভাবা উচিত। এক্ষেত্রে একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। প্রতিটি এলাকায় যেসব মাহফিল হয় এগুলোর মধ্যে একটি সমন্বয় করা। অনেক সময় দেখা যায় পাশাপাশি কয়েকটি মাহফিল হয়, আর প্রতিটি মাহফিলেই ঘুরেফিরে একই ধরনের আলোচনা করেন বক্তারা। এক্ষেত্রে পরিক ল্পিতভাবে বিষয় নির্বাচন করা যেতে পারে। যারা মাহফিল করেন তাদের মধ্যে একটা আন্তঃযোগাযোগ এবং সমন্বয় থাকা দরকার। এতে জনস Tধারণের উপকার হবে। সাধারণ। মুসলমানদের যেহেতু উপকারের জন্যই অর্থ ও শ্রম খরচ করে মাহফি লগুলো আয়োজিত হয়ে থাকে সুতরাং তাদের উপকারটা কীভাবে বেশি হবে সেটা সবার ভাবা উচিত। সর্বোপরি ওয়াজ মাহফিলের নামে সম্প্রতি অযাচিত যা কিছু ঘটছে তা থেকে বিরত থাকতে হবে। না হলে এই মাহফিলগুলো শুধু তার প্রভাবই হারাবে না, দীনের ক্ষতির কারণও হতে পারে। আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন।

1 thought on “ওয়াজের নামে কী হচ্ছে এসব!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *