কেন পিছিয়ে পড়তে হয়েছিল?

মুহাম্মাদ নূরুল্লাহ

উন্নত সাহিত্য রচনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ও মুসলমানের বাচ্চা ধারা উজিয়ে সেই সাহিত্যে সুযোগ থাকা জরুরি। পারিবারিক সুখ সাচ্ছন্দও অবগাহন করতে আসলেও যে তারা তাকে গ্রহণ প্রয়োজন হয়। ইংরেজ আমলে যে নতুন ধারার করতেন; বিষয়টি এমন নয়। সেই সাহিত্যে সাহিত্য গড়ে ওঠে এবং বাংলা ভাষার সাবেক নাম লেখাতে হলে কিংবা তার স্বীকৃতি পেতে ঐতিহ্য ও রূপ ছেটে ফেলা হয় তার মধ্যে হলে স্বজাতির প্রতি দরদ রেখে কিছু করার মুসলমানদের অবগাহন করা এবং রাতারাতি সুযোগ বোধ হয় ছিল না। বরং বলতে হয় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব ছিল কিনা সেটা আনিসুজ্জামানের ভাষায়, “বাঙালি মুসলমানের আমাদের ভেবে দেখতে হবে। মুসলমানরা হাতে আধুনিক সাহিত্যের যে ফসলটুকু গড়ে তখন অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে মশগুল। সে উঠেছে দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাি অবস্থায় উন্নত গল্প কবিতায় হাত পাকানোর সকদের দ্বারা তা সাধারণভাবে উপেক্ষিত

মোশাররফ হোসেনরাও যখন অযুর বদলে রপ্ত করার জন্য ইউরোপীয় সাহিত্য যে মনোযে- অঙ্গশুদ্ধি, নামাযের বদলে প্রার্থনা, রোযার গ দিয়ে অধ্যয়ন করা ও আত্মস্থ করা দরকার পরিবর্তে উপবাস যাপন লিখতেন, তখনও ছিল, নানান সংকটের কারণে ইংরেজি বিদ্যা সবাই তাকে গ্রহণ করেনি। তার রচনা কোনো শিক্ষা করতে তাদের তাতে সাড়া দেওয়া সম্ভব হিন্দু ভদ্রলোলোকের রচনা বলে দাবি করতে ছিল কিনা ভেবে দেখতে হবে। শুধু অভিযোগ দেখা গেছে করা যে তাদের মধ্যে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের মতো যা হোক এই সাহিত্যের গতিধারা সম্পর্কে

অনুশীলন করে যাওয়া আদৌ তাদের জন্য কতটুকু সম্ভব ছিল, তাছাড়া আধুনিক সাহিত্য হয়েছে। Tসঞ্জাত বিবেকবান মানুষ সেটা বুঝতে

প্রতিভা কেন জন্ম নিল না, কেন তারা ইংরেজের জানবার আগে আমাদের জানতে হয়, তা সৃষ্টির বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেন, হিন্দুর মতো প্রেক্ষাপট ও সে সময়কার আর্থসামাজিক ভাঙন খাতির করলেন না, ইংরেজের সঙ্গে আপোস ও পরিবর্তন সম্পর্কে। বাংলার সাতশ’ বছরের করে বৈষয়িক সুবিধাটুকু হাত করতে চাইলেন মুসলিম রাজত্বের অবসান ঘটল এক না- এ জাতীয় কথাবার্তা যে ইতিহাস-অজ্ঞত দুর্ভাগ্যজনক পরিহাসের মধ্য দিয়ে। এই ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার ফল মুসলমানদের মনে পারবেন। পূর্বপুরুষের জীবনসংগ্রাম ও তাদের দারুণ যন্ত্রণার সৃষ্টি করেছিল। যে জন্য একশ’ প্রতি সামান্য দরদ কিংবা মমতা থাকলে এ বছরব্যাপী বাংলাদেশের মানুষকে অর্থ এবং জিনিসটা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। বরং লোক দিয়ে ব্রিটিশবিরোধি মুজাহিদ আন্দোলন তাদের কর্তব্য পালন সম্পর্কে, জাতিকে ধরে সজীব রাখতে দেখা যায়। মুর্শিদাবাদের যখন রাখার সংগ্রামে তাদের ত্যাগ ও বিচক্ষণতার পতন হয় তখন (১৭৯৬ খৃ.) ঢাকার নামনাত্র প্রশংসাই করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বাবুৱা নবাব শামছউদ্দৌলা তার দূতদেরকে যখন ওই সাহিত্য সৃষ্টি করে, তখন কোনো পাঠিয়েছিলেন অযোদ্ধার ওয়াজির আলি হয়ে আফগানিস্তান, ইরান গিয়ে ঢাকা উদ্ধার করার আবেদন জানাতে। তখন ওমানের মাস্কট থেকে কয়েক জাহাজ সৈন্য ও অস্ত্র কলকাতা বন্দরে এসে পৌঁছে, তারা শামছের আদেশের অপেক্ষা করছিল, এমন সময় ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়। ইংরেজরা শামছকে করে। ১৮৩১ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। বেনিয়াকে হঠানোর ঢাকাকেন্দ্রিক কোনো চেষ্টাই সাফল্য লাভ করতে পারেনি। এর ১৭৬৪ সালের ২২ অক্টোবর দিল্লির সম্রাট, অযোদ্ধার নবাব ও মীর কাশি-ে ঘর সম্মিলিত বাহিনি বকসারের যুদ্ধে বাংলার মসনদ কর্তৃত্ব থেকে ইংরেজ বাহিনী ও বিদেশি কর্তৃত্ব নস্যাৎ করতে আক্রমণ চালান। দেওয়ান সেতার তখন সম্রাটের রায়, নবাব শুজাউদ্দিনের মন্ত্রী বেণী বাহাদুর ও কাসিমের সেনাপতি মার্কাট ও আরাটে- ান চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে। এই বিশ্বাসঘাতকতা ও শীয়া শুজাউদ্দিনের সৈন্যদের কিছু উচ্ছৃঙ্খলার কারণে ইংরেজ হঠানোর বিরাট উদ্যোগ মাঠে

মারা যায়। মুঘল আমলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের যোগাযোগ খুব ঘনিষ্ট হয়ে পড়েছিল বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। দেশের ভেতরে হিন্দু মুসলমাে নর সম্পর্কও ঘনিষ্ট ছিল

দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত প্রত্যেকটি আন্দো- লন নস্যাৎ হয়েছে কোনো না কোনো বিশ্বাসঘাতকের গাদ্দারির কারণে। বালাকোটের রণাঙ্গন থেকে আযাদি আন্দোলন পর্যন্ত, টিপু সুলতানের লড়াই থেকে রেশমি রুমাল আন্দোলন প্রত্যেকটি স্বাধীনতার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল যে বিশ্বাসঘাতকদের কারণে তাদের প্রতি ইংরেজি শিক্ষিত ঐতিহাি সকলের ক্ষোভ খুব সামান্যই। বরং যত ক্ষোভ তাদের বর্ষিত হতে দেখা যায়। ওলামায়ে কেরামের ওপর, যারা অন্ধকার দিনগুলোতে জাতিকে দিশা দিয়েছিলেন। হতাশ জনগণের সামনে আশার আলো জ্বেলে রেখেছিলেন আমাদের ইতিহাসের প্রতিটি জাতীয় আন্দোলন ওলামায়ে কেরাম দ্বারা প্র পেয়েছিল সে সত্য আজ অস্বীকার করা গেলেও ইতিহাসের সেই দিনগুলিতে অস্বীকার করে যাওয়ার জোঁ ছিল না। এখানে স্মরণীয়, ব্রিটিশ তাড়িয়ে স্বাধীনতা লাভের পর ওলামায়ে কেরাে মর নেতৃত্বে যে ধরনের রাষ্ট্রকাঠামো সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হয়েছিল তাতে ফেব্রুয়ারী ‘২০ ইং

সব জাতির অধিকার স্বীকার করা হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি সেখানে ক্রিয়াশীল ছিল না। আধুনি কতা, বিজ্ঞানচর্চা, উন্নত সাহিত্য রচনা, বৈষয়িক উন্নতি গ্রহণের ওপর তাদের পক্ষ থেকে কোনো ক্ষুদ্র দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেওয়া হয়নি মোটেও। নানান ঐতিহাসিক বাছবিচারের দ্বারা আমরা বুঝতে পারি, ভারতবর্ষ ওলামায়ে কেরাম যেভাবে চেয়েছিলেন সেভাবেই আগে স্বাধীন হলে সকল মানুষের লাভ ছিল। আজ যেমনটা হয়েছে, তেমন দুর্দশা সাধারণ মানুষের কপালে কোনোদিন ঠেকত না

সম্পন্ন গ্রামগুলো নিঃস্ব হতে থাকে। ১. অর্থের প্রবাহ চলে যায় শহরে। গ্রাম ছেড়ে ধনী শিক্ষিত রুচিবান মানুষেরা শহরে চলে যেতে থাকে। অর্থনৈতিক কাঠামোয় নতুন শ্রেণিবিন্যাস শুরু হয়। ২. পুরনো জমিদারির পতন ঘটে। মধ্যযুগীয় ইউরোপের স্টাইলে নতুন ধরনের জমিদারি প্রথা চালু হয়। এরা আসে হিন্দু সম্প্রদায় থেকে। পুরনো অভিজাত হৃদয়বান মানুষদের (যারা ছিলেন নামেমাত্র জমিদার, মুসলিম প্রশাসনের পদস্থ কর্মচারী, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে বরখাস্ত করা হতো।) পতন হয়। তাদের সঙ্গে সেই সব মানুষও ভাগ্য- ড়িত হয়ে উচ্ছন্নে যায় যারা জীবনজী বিকায় তাদের ওপর নির্ভর করতো। ৩. পেশাজীবি, কারিগরদের শোচনীয় অবস্থা দাঁড়ায়। কিন্তু বাণিজ্যে অধিষ্ঠিত नि বেনিয়া ইংরেজের সহযোগি পার্শ্বচর হিন্দুরা। ফলে সে সময় যে মধ্যবিত্ত সমাজ তৈরি হয় তারা সবাই প্রায় হিন্দু। সাহিত্য চর্চার সুযোগ তারা লাভ করে। তারা ইউরোপীয় সাহিত্য আত্মস্থ করে অনেকটা রাজানুকুলে, নিজেদের ধর্মীয় সামাজিক স্বার্থে বাংলা সাহিত্যে ইউরোপীয় স্টাইল ও প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে। এই অবস্থায় জন্ম নেওয়া সাহিত্যের মধ্যে স্বাভাবিক কারণেই গরীব জনগণের কথা ছিল না। সাহিত্যে উঁচু ঘরের ব্যক্তিরা উঁচুদের কথাই ব্যক্ত করতে থাকেন। সাধারণ মানুষের দুঃখ, দুর্দশা, অম্লরুটির সংগ্রাম, অধিকার আদায় কোনোটাই তাদের দিয়ে বলানো যায়নি। বাংলা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠালগ্নে আমরা দেখি এক কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল জমিদারের দল তাদের আধিপত্য বিস্তার করে আছে। তাদের ইচ্ছার

বাইরে যাওয়া খুবই ঝুঁকির কাজ ছিল। আঠারোশ’ সাতারের আযাদি আন্দো লনের পর মুসলমানদের মধ্যে গড়ে ওঠে কয়েকজন মধ্যবিত্ত পরিবার, তাদের সামনে আসতে দেখা যায়, ইংরেজও কিছুটা নরম হয়। সেই সব ব্যক্তির সঙ্গে আলেমগণের কোনো বিরোধ ছিল না। কারণ, এরই এক যুগের মধ্যে উত্তর ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসা গড়ে ওঠে এবং সেখানকার আলেমগণ ভারতবর্ষকে রাজনৈতিকভাবে করার পরিকল্পনা স্বাধীন নিয়েছিলেন। আলীগড় ও নবাব আব্দুল লতীফের ইংরেজ আমলে আমাদের সমাজে বড় মতকে সমর্থন করলেন বাংলাদেশের ধরনের রদবদল হতে দেখা যায়। মাও. কেরামত আলী জৈনপুরী রহ ভারতবর্ষের মুসলমানদের অধিকার আদায় ও মুক্তি নিশ্চিত করতে তারা একযোগে কাজ করেন। এসব মনীষী মুসলমানদের ইংরেজি বিদ্যা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেন ইংরেজি শিখে তাদের শক্তিশালী হতে বলেন। ১৮৭০ সালে মুসলমানদের জন্য ইংরেজি শিক্ষার দুয়ার খোলে। এর আগে তা সম্ভব ছিল না। একে তো ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া হত যেসব প্রতিষ্ঠানে; যেমন হিন্দু কলেজ, সংস্কৃত কলেজ এগুলোর কোনোটাতে তাদের ভর্তি করা হত না। মাদরাসায়ে আলিয়া থাকলেও তাতে ১৮৩০ সালের পূর্বে ইংরেজি বিভাগ খোলা হয়নি। এরপর এই বিদ্যার এত বেশি বাজারমূল্য নির্ধারন করা হয়েছিল যে অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়া মুসলমানদের

জন্য সে সুযোগ আর থাকেনি। ব্রিটিশ ক্ষমতা দখলের পূর্বে বাংলার রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ। সেখানকার মালিকানা, সাংস্কৃতিক অধিকার মুসলমানদেও বেশি ছিল। ইংরেজ মুসলমানদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ভাবে পঙ্গু করার লক্ষেই কলকাতাকে রাজধানীরূপে গড়ে তুলল রাজধানীতে মুসলমানদের অধিকার নিশ্চিত হয়নি। এখানকার সংস্কৃতিও গড়া হয় ইংলো- ব্রাহ্মণ পরিকল্পনা অনুসারে। এর আগে হিন্দুরা খুব ফার্সি শিক্ষা করত। তাদের নেতা রামমোহ নরা ইংরেজি। শিখবার। আহ্বান জানাল মুসলমানদের সে ডাকে সাড়া দেওয়ার কারণ ছিল না। বিশেষ কারণ: কিন্তু এরপর ১৮৩৫ সালে রাজা রামমোহন -এক সময়কার মুসলমান নবাবের বিশেষ চাকুরে, আরবি ফার্সিতে বিশেষ দক্ষ সে নিজেই ব্রিটেন সফর করলো। আবেদন নিয়ে যে, ভারতবর্ষের সরকারী ভাষা ঘোষণা করা হোক ইংরেজিকে।

পূর্বে নবাবী আমলে শিক্ষার মান যথেষ্ট উন্নত ছিল। এখানকার জনসাধারণ সাধারণভাবে সবাই শিক্ষিত ছিলেন। এবং তৎকালীন ভারতবর্ষের শিক্ষার মান ছিল বিশ্বের অন্য সব রাষ্ট্রের শিক্ষার চেয়ে উন্নত সর্ববাদীসম্মত। ইংল্যান্ডে তখন গীর্জাকেন্দ্রিক নিম্নস্তরের শিক্ষাই চালু ছিল। মুসলমানরা যে ভালো শিক্ষিত ছিলেন এ কথা ১৮৬৮ সালের শিক্ষাকমিশন কর্তৃক বাংলা বিহারের যে রিপোর্ট দেওয়া হয়, তাতে ইংরেজ শিক্ষা অফিসার অ্যাডাম তা স্বীকার করেছেন। উইলিয়াম হান্টার বলেছেন, “হিন্দুরা নিঃসন্দেহে উৎকষ্ট মেধার অধিকারী কিন্তু সরকারী কর্মক্ষেত্রে একচেটিয়া অধিকার ভোগ করার জন্য যেমন সর্বজনীন অনন্য মেধার দরকার হয় বর্তমানে তা তাদের নেই এবং তাদের অতীত ইতিহাসও একথার পরিপন্থী। বাস্তব সত্য হল এই যে, এ দেশের শাসন ক্ষমতা যখন আমাদের হাতে আসে তখন মুসলমানরাই ছিল উচ্চতর জাতি। শুধু মনোবল, বাহুবে পর দিক হতেই উচ্চতর নয়, রাজনৈি তক সংগঠন পরিচালনায় দক্ষতা এবং সরকার চালনায় বাস্তব জ্ঞান এর দিক দিয়েও তারা ছিল উন্নততর জাতি। এ সত্ত্বেও মুসলমানদের জন্য এখন সরাকরি চাকরি এবং বেসরকারি কর্মক্ষেত্র এই উভয় ক্ষেত্রেই প্রবেশ পথ বন্ধ হয়ে গেছে।”

ইংরেজ পূর্ব আমলে রাষ্ট্র কাঠামোর সকল গুরুত্বপূর্ণ স্তরে মুসলমান কর্মকর্তারা বেশ যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতেন এসে সর্বপ্রকার চাকুরি থেকে তাদেরকে উৎখাত করে। পলাশীর যুদ্ধের পর কোম্পানির আদেশে মীর জাফর আশি হাজার সৈন্যকে বরখাস্ত করে। ওয়ারেন হেস্টিংস বাকি সৈনিকদের বরখাস্ত দেয়। চাকরিচ্যুত করে মুসলমানদের স্থানে হিন্দুদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

১৮৩৭ সালে রাষ্ট্রভাষা ফারসির স্কুলে ইংরেজি ঘোষণা হয়। ১৮৪৪ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঘোষণা করে যে, ইংরেজি করেন ডিগ্রিপ্রাপ্তরাই চাকুরি পাবে। সরকারি চাকুরিতে অন্যদের গ্রহণ করা হবে। না।” চাকুরিক্ষেত্রে বৃটিশের মনোভাব বোঝা যায় জন ম্যাকলের বক্তৃতা থেকে। তিনি বলেন, “ভারতের হিন্দুদের সহযোগিতাই আমাদের

ফেব্রুয়ারী ‘২০ ইং

নিরাপত্তার প্রাধান সহায়।” এডিনবরো বলেন, “মুসলমানরা বরাবরই আমাদের শত্রু। ভারতে আমাদের নীতি হবে হিন্দুদের প্রতি আমাদের হাত প্রসারিত রাখা।” ব্রিটিশের সুকৌশল হস্তক্ষেপ আর

ধ্বংসনীতির কারণে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ ঢুকে শুকে মৃত্যুবরণ করে। এরপর কয়েক দশক অশিক্ষা, দুর্ভিক্ষ আর নির্যাতনের জাঁতাকলে এ দেশের মানুষ পিষ্ট হয় অশিক্ষিত হয়ে যায় কয়েকটি প্রজন্ম। এরপর যখন বিলাতেই পাদ্রীরা ভারতী- য়দের গীর্জাকেন্দ্রিক শিক্ষা দিতে সরকারের কাছে দাবি জানাতে থাকে তখন ব্রিটিশ সরকার প্রথম প্রথম ভারতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করতে বিরোধিতা করে। তাদের বক্তব্য ছিল, নেটিভরা শিখতে চাইলে বিলাত এসে শিখবে। যখন ভারতে মুসলমান কর্তৃক পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে যায় তখন হিন্দু জমিদাররা স্কুল কলেজ খুলে দিয়ে নিজেদের সন্তানদের শিক্ষার আলোয় শাত করার ব্যবস্থা নেয় কিন্তু পিছিয়ে যায় মুসলিম সন্তানরা। এদিকে রাষ্ট্রীয় বাজেট বাতিল করে দিয়ে সমৃদ্ধ মাদরাসা শিক্ষাকে ধ্বংস করা হয়। বাংলা ও ভারতবর্ষে প্রথমে শিক্ষা বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া হয় পাদ্রীদের হাতে। পরবর্তীতেও এই পাদ্রীরা শিক্ষাব্যবস্থায় নিজেদের আসন পোক্ত করে। এই পাদ্রীরা ছিল আক্রমণাত্মক হিংস্র প্রকৃতির। বিশেষত ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে তাদের হিংসার অন্ত ছিল না। বাংলার হাঁটে-মাঠে-ঘাটে ঘুরে ঘুরে তারা এই নিম্নপ্রবৃত্তির পরিচয় দিত। দেশীয়দের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করত। তাদের টিকিটি স্পর্শ করার ক্ষমতা কারোর ছিল না। এই মনোভাবের পাদ্রী সম্প্রদায় যখন এ দেশে স্কুল খুলে শিক্ষা বিস্তারের মহান উদ্যোগ গ্রহণ করে, তখন আমাদের দেশীয় ব্যক্তিদের আপত্তি তোলা স্বাভাবিক বিষয় ছিল। শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই পাদ্রীদের হাতে তুলে দেওয়ার তারা বিরোধিতা

আমাদের আধুনিক শিক্ষা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় তাতে বিজাতীয় আধিপত্য, ইসলামবিদ্বেষ, ইউরোপীয় সংশয়বাদ, হিন্দু ধর্মের দেবদেবি খ্রিস্টান ধর্মের ত্রিত্ববাদ ইত্যাদিও শেকড় গাড়ে ঐ ধারার শিক্ষার্থীদের

মনে। বাংলাদেশে ১৭৯৩- ১৮১৪ পর্যন্ত সমস্ত স্কুল খুলে শ্রীরামপুরের পাদ্রীরা। মুসলিম আমলের মক্তবের মতো অসংখ্য স্কুল তারা খুলেছিল বিশেষ উদ্দেশ্যকে পুঁজি করে। শ্রীরামপুর মিশনের প্রধান পাদ্রী উইলিয়াম কেরী ১৭৯৩ সালে বাংলায় আসে। সে নিজ উদ্যোগে বাংলা ভাষা শিক্ষা করে। তারপর ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপন করা হয়, ১৮০১ সালে সেখানে বাংলা বিভাগ খোলা হয়। ডাকা হয় কেরীকে ওই বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য। বিষয়বুদ্ধিসম্পন্ন বেনিয়া শাসক পাদ্রীদের ধর্মপ্রচারে ১৮১৩ সাল পর্যন্ত সাময়িক বাঁধা দিয়ে রেখেছিল। এবার সুযোগ বুঝে কেরি তার পক্ষে খ্রিস্টবাদ প্রচারের জন্য অনেকগুলো দাবি আদায় করে নেয়।

পূর্বে বাংলাদেশে শিক্ষার জন্য যেসব সুবিধা ছিল, যেমন- বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সমস্ত শিক্ষাই বিনামূল্য, ছাত্রদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, শিক্ষকদের আবাসিক উচ্চবেতনে খেদমত করার সুযোগ; সবই বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার মতো একটি মহান বিষয়কে বাণিজ্যের বস্তু বানিয়ে ফেলে এই অযোগ্য বেনিয়ার দল। পূর্বে শিক্ষাখাতে যে সব বরাদ্ধ ছ তার অনেকটাই সমাজসেবক মুসলমান দানশীল ব্যক্তিরাই ব্যবস্থা করতেন। সেসব সম্পত্তি ও টাকাও ইংরেজ নিজে খেয়ে ফেলে। উদাহরণস্বরূপ শিক্ষার জন্য ওয়াকফকৃত হাজী মুহসিনের সম্পত্তি থেকে ইংরেজরা ১৮১৬ সালে সাড়ে বাইশ লাখ টাকা হস্তগত করে। এর দু’বছর আগে ইংল্যান্ডের পাদ্রীদের পীড়াপীড়ির কারণে ১৮১৪ সালে তারা ভারতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করার কথা দেয়। এ জন্য বাজেটও বরাদ্দ করে এক লক্ষ টাকা মাত্র। কিন্তু সেই ঘোষণা বাস্তবায়ন হয় ১৮৩০-এর পর। উক্ত বরাদ্দকৃত টাকা তারা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যয় করেনি। পাদ্রীদের যুক্তি ছিল, ভারতে শিক্ষাব্যবস্থা কব্জা করতে পারলে এর মাধ্যমে মগজধোলাই করে শিশু ও যুবকদের খৃস্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করা যাবে। তাছাড়া ইউরোপীয় শিক্ষার মাধ্যমে ভারতে তাদের মতাদর্শের লোক গড়ে উঠবে। কোম্পানির আশঙ্কা ছিল, শিক্ষা যে মাধ্যমেই চালু হোক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *