ছোটদের বন্ধু প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

ছোটদের বন্ধু প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
লেখকঃ মুহাম্মাদ আবু উমামা

আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছোটদেরকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি সফর থেকে ফেরার পথে কোনো শিশুকে দেখতে পেলে বাহন থেকে নেমে তাকে বাহনে তুলে নিতেন। জামাতে নামাযে দাঁড়িয়ে মসজিদের ভেতর কোনো শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলে তিনি কিরাত সংক্ষিপ্ত করে দিতেন, যাতে শিশুদের এবং তাদের মায়েদের কষ্ট না হয়।

নবীজির নিকট মৌসুমের নতুন ফল আনা হলে তিনি সবার আগে উপস্থিতদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সী শিশুকে তা দিতেন। তিনি ছোটদের পিঠে ও মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতেন। একবার নবীজি এভাবে শিশুদেরকে আদর করছিলেন এমন সময়ে একজন গেঁয়ো লোক এসে বলল- তোমরা শিশুদেরকে আদর কর! আমার দশটি শিশু সন্তান আছে, আমি আজ পর্যন্ত কাউকে আদর করিনি। নবীজি তার কথার জবাবে বললেন, ‘আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে মায়া মমতা কেড়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে আমি আর কী করব?’ আসলে লোকটির ভুল ভাঙ্গিয়ে দেয়ার জন্যই নবীজি এভাবে তার কথার জবাব দিয়েছেন। হয়তো লোকটি তার ভুল বুঝতে পেরেছে।

একদিন এক সাহাবি তাঁর ছোট্ট একটি মেয়েকে সাথে নিয়ে নবীজির দরবারে উপস্থিত হলেন। মেয়েটির পরনে ছিল লাল জামা। নবীজি ওকে দেখেই বলতে লাগলেন ‘বাহ! বাহ!’ এরপর মেয়েটি নবীজির সাথে মিশে আনন্দ করতে লাগল। একপর্যায়ে তার ছোট্ট চোখদুটো চলে গেল প্রিয়নবীর মোহরে নবুওতের দিকে। মোহরে নবুওত হল আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া নবুওতের সীল। যা নবীজির পিঠ মুবারকের উপরিভাগে কবুতরের ডিমের মতো শোভা পেত। মেয়েটি তা দেখে দারুণ কৌতূহলী হয়ে উঠল। সে মোহরে নবুওতের সাথে খেলতে লাগল। সাহাবি তাঁর মেয়েকে ধমক দিলেন। প্রিয়নবীজি সাহাবিকে বললেন, ‘আহা ওকে খেলতে দাও!’

আরেকবার প্রিয়নবীজির দরবারে কয়েকটি কাপড় এল। তার মধ্যে একটি কালো চাদরও ছিল। কাপড়টির উভয় দিকে ছিল সুন্দর আঁচল। নবীজি উপস্থিত লোকদেরকে লক্ষ করে প্রশ্ন করলেন, ‘এটি কাকে দেব? কেউ কোন জবাব দিল না। তারপর নবীজি নিজেই বললেন, ‘উম্মে খালেদকে নিয়ে এসো।’ উম্মে খালেদ এলে তাকে চাদরটি পরিয়ে দিয়ে বললেন, “পরবে আর পুরান বানাবে। পরবে আর পুরান বানাবে। পরবর্তীতেও দেখা হলে কাপড়ে খচিত ফুলের দিকে ইশারা করে নবীজি বলতেন, ‘উম্মে খালেদ! দেখো কত সুন্দর, কত সুন্দর। উম্মে খালেদ প্রিয়নবীজির আচরণে খুব আনন্দ পেত।

সাহাবি হযরত জাবের ইবনে ছামুরাহ রা. তার ছোট্টকালের ঘটনা বর্ণনা করেন একবার আমি নবীজির পেছনে নামায আদায় করলাম। নামায শেষে তিনি তাঁর ঘরের দিকে চললেন। আমিও সাথে সাথে চললাম। আমাকে যেতে দেখে আরো কয়েকজন শিশু নবীজির সাথে চলল। নবীজি সবাইকে খুব আদর করলেন। সেই সাথে আমাে

এক সাহাবি বর্ণনা করেন, আমি খুব ছোটবেলা এক আনসারির বাগানে গিয়ে খেজুর গাছে ঢিল মেরে খেজুর পেড়ে খেতাম। একদিন হঠাৎ ধরা পড়ে গেলাম। লোকজন আমাকে ধরে সোজা নবীজির দরবারে নিয়ে এল। নবীজি সা. আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ‘তুমি গাছে ঢিল ছোঁড় কেন?’ আমি বললাম, ‘খেজুর খেতে।’ নবীজী বললেন, ‘যেসব খেজুর গাছ থেকে ঝরে পড়ে তা-ই কুড়িয়ে খাবে, গাছে ঢিল ছোঁড়বে না। মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন এবং আমাকে দোয়া দিলেন। বলে নবীজি আমার

তোমরা জেনে থাকবে, নবীজির সাথে হযরত আয়েশার যখন বিয়ে হয় তখন তিনি খুবই অল্পবয়সী ছিলেন। মাত্র ছ’বছর বয়সে বিয়ে হয় এবং তুলে নেয়ার সময়ে হযরত আয়েশার বয়স ছিল মাত্র না’বছর। হযরত আয়েশা রা. তাই নবীজির ঘরে এসেও অন্য মেয়েদের সাথে খেলতেন। নবীজি তাতে বাধা দিতেন না। ফলে নবীজি বাইরে কোথাও গেলে হযরত আয়েশার বান্ধবীরা দল বেঁধে খেলতে আসতো তাঁর ঘরে।

হঠাৎ যখন নবীজি ঘরে প্রবেশ করতেন তখন তারা দিকবিদিক ছুটে পালাত। নবীজি সা. তাদেরকে ডেকে ডেকে বলতেন যেয়ো না, যেয়ো না, খেলো তোমরা। একদিন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথাও যাচ্ছিলেন। আদরের দৌহিত্র হুসাইন তখনো খুবই ছোট্ট। নবীজি হুসাইনকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন। প্রিয় নানাজানকে দেখে হুসাইন কাছে এল বটে। কিন্তু সে সহজে ধরা দিচ্ছিল না। কাছে এসে এসে ছলনা করে আবার দূরে সরে যাচ্ছিল। শিশুরা এমন দুষ্টুমি করে কিন্তু ঢের আনন্দ পায়। অবশেষে একবার নবীজি সা. হুসাইনকে ধরেই ফেললেন। জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘হুসাইন আমার, আমি হুসাইনের।

আরেকদিন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে ভাষণ দিচ্ছিলেন। হঠাৎ শিশু হুসাইন লাল জামা পরিধান করে ধীরে ধীরে তাঁর কাছে চলে এল। নিতান্তই অল্পবয়সী হওয়ার কারণে কাঁপাকাঁপা পায়ে হাঁটছিল সে। নবীজি স্নেহের টানে মিম্বর থেকে নেমে এলেন। আদরের হুসাইনকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন- ‘আল্লাহ ঠিকই বলেছেন, তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের পরীক্ষাস্বরূপ।

আরেক দিন নবীজি সা. হযরত হাসান ইবনে আলী রা.-কে কাছে ডাকলেন। হাসান দৌড়ে এসে কোলে চড়ে বসল। তারপর প্রিয় নানাজানের দাড়ি মুবারকে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে খেলা করতে লাগল। নবীজি এক পর্যায়ে তাঁর পবিত্র মুখ খুলে দিলেন। হাসান পরমানন্দে এবার মুখের ভেতরে আঙ্গুল ঢুকিয়ে খেলা করতে লাগল। নবীজি বিধর্মী শিশুদের প্রতিও স্নেহশীল ছিলেন। তিনি বলতেন, ‘প্রত্যেক শিশুই আল্লাহর স্বভাবধর্মের

ওপর জন্মগ্রহণ করে। তারপর পিতামাতা তাকে ইহুদি নাসারা ও অগ্নিপূজক বানায়। নবীজির এক নাতনীর নাম ছিল উমামা। তিনি তাকে খুবই আদর করতেন। নামায পড়ার সময়ও ওকে সাথে রাখতেন। নবীজি নামাযে দাঁড়ালে সে কাঁধে চড়ে বসত। রুকু করার সময় নবীজি তাকে কাঁধ মুবারক থেকে নামিয়ে দিতেন। দাঁড়ালে আবার সে কাঁধে চড়ে বসত। বিভিন্ন হাদীসের আলোকে বোঝা যায়, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই এভাবে তাকে তুলে দিতেন। আবার বুকু করার সময় নামিয়ে দিতেন।

এক সাহাবি তার অন্ধকার জীবনের একটি ঘটনা বর্ণনা করছিলেন। তিনি বলছিলেন, জাহেলিয়াতের যুগে আমার ছোট্ট একটি মেয়ে ছিল, আমি আরবের প্রথানুযায়ী আমার ছোট্ট মেয়েটিকে জীবন্ত কবর দিতে নিয়ে যাই। যখন মাটিতে তাকে গেড়ে ফেলছিলাম তখন সে দু’হাত বাড়িয়ে বাড়িয়ে আব্বা আব্বা বলে চিৎকার করছিল। আর আমি তখনো ওর শরীরের ওপর মাটি তুলে দিচ্ছিলাম। ও রীতিমতো চিৎকার করে যাচ্ছিল। আর আমি নির্দ্বিধায় মাটি ফেলে যাচ্ছিলাম, এক সময়ে ওর ছোট্ট শরীরটা মাটির ভেতর হারিয়ে গেল। তার প্রাণ পাখিটিও উড়ে গেল।

এই চরম নিষ্ঠুরতার কাহিনী শুনে নবীজির চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে লাগল। সাহাবির কথা শেষ হলে নবীজি তাকে ঘটনাটি আবারো বলতে বললেন। সাহাবি তার সেই নিষ্ঠুরতার কাহিনীটি দ্বিতীয়বার শোনালেন আর নবীজি কাঁদতে থাকলেন। চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি মুবারক ভিজে গেল। একবার মদীনায় ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। ক্ষুধায় কাতর হয়ে একটি বালক ফলের কোনো বাগান থেকে কয়েকটি ঝরা ফল কুড়িয়ে খেলো, আর কয়েকটি কোঁচড়ে গুঁজে নিল। ফেরার পথে মালিক দেখে ফেললে সে ছেলেটিকে আচ্ছামতো প্রহার করে তার জামা কাপড় খুলে রেখে দিল। ছেলেটি অসহায়, কার কাছে যাবে। কাঁদতে কাঁদতে সে রহমতের নবীর দরবারে হাজির হল। গিয়ে কেঁদে কেঁদে অভিযোগ করল নবীজির কাছে। নবীজি ছেলেটিকে সান্ত্বনা দিলেন। তারপর মালিককে ডেকে পাঠালেন। উপস্থিত হলে তাকে আচ্ছামতো শাসালেন। পরে উপদেশের মাধ্যমে লোকটিকে তার অপরাধের কথা বুঝিয়ে দিলেন। মালিক দারুণ লজ্জিত হল। আর কখনো এমন আচরণ না করার শপথ নিয়ে বিদায় নিল।

প্রিয়নবী সা. ছোটদেরকে কেমন ভালোবাসতেন, তা আশা করি তোমরা বুঝতে পেরেছ। এসো আমাদের বন্ধু প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমরাও ভালোবাসি। আমাদের প্রতিদিনের জীবনে তার আদর্শ মেনে চলি।

2 thoughts on “ছোটদের বন্ধু প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *