পাশ্চাত্যের বর্ণবাদ বনাম ইসলামের সাম্য

আলোকজ্জ্বল সভ্যতার অপর নাম হল ইসলাম। ইসলামের প্রতিটি বিধান সভ্যতার প্রতীক। ইসলামের এসব বিধান ও নীতিমালাই হল মানুষের মুক্তির মূল উৎস। মানুষ যখন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিমজ্জিত ও পরষ্পর খুন রাহাজানিতে লিপ্ত ছিল, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল দরিদ্রের জীবন, ঠিক তখনই ইসলাে মর অনুপম আদর্শ ও সভ্যতা নিয়ে আগমন করলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি এমন এক সভ্যতা নিয়ে আসলেন, যা মানবজাি তকে সাম্যের নীতি শিক্ষা দেয়। উচু নিচু সকল জাতের মানুষকে একই সারিতে দাঁড় করিয়ে দেয়। যে সভ্যতা প্রমাণ করে দেয় যে, বৈষম্যহীনতা ও সাম্যের মাঝেই মানবজাতির সফলতা নিহিত রয়েছে।

আমরা যদি ইসলামে ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে সাম্য ও বৈষম্যহীনতার অনুপম দৃষ্টান্ত খুঁজে পাব। বিদায় হজের ভাষণে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখ নিসৃত বাণীতে উঠে সাম্যের মহান বিধান। তিনি বলেছেন: আজমীর ওপর আরবীর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আল্লাহর আদালতে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হল তাকওয়া। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে লক্ষ্য করলে আমরা দুই শ্রেণির মানুষ দেখতে পাই। এক. শাসক। দুই. শাসিত। শাসকগোষ্ঠী সাধারণত জনসাধারণের সম্পদে বিলাসিতায় ডুবে থাকে। ইসলামী সালতানাতের শাসকগণ কি এমনই ছিলেন? না, তারা অন্যান্য শাসকগোষ্ঠীর মতো ছিলেন না। তাদের মধ্যে ছিল না কোনো বিলাসিতা ও লোভ-লালসা। তারা নিজেদেরকে সাধারণ প্রজার সমতুল্য মনে করতেন।

হযরত ওমর রা. ছিলেন প্রজাদরদী ও সত্যাশ্রয়ী রাষ্ট্রপ্রধানের এক উজ্জল দৃষ্টান্ত। তার দৃষ্টিতে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। সকলেই ছিল তার নিকট সমান। তাই তো অপরাধ করার কারণে তিনি নিজ সন্তানকেও ক্ষমা করেননি। তিনি ছিলেন ঈমানী বলে বলিয়ান এক খোদাভীরু শাসক। রাতের আঁধারে ছদ্মবেশে মদীনার অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়াতেন। গোপনে প্রজাদের খোঁজ-খরব নিতেন।

হযরত আবু বকর রা. ছিলেন কোমল হৃদয়ের অধিকারী এক দয়ালু শাসক। মানবসেবাকে তিনি নিজ দায়িত্ব মনে করতেন। খলীফা হওয়ার পরও তিনি পাড়ার এতিম মেয়েদের বকরির দুধ দোহন করে দিতেন। আর বলতেন: আমার খেলাফত কালে আমার দায়িত্বে যেন কোনো ত্রুটি না হয়, এটাই আমার কাম্য।

মুসলিম খলীফাদের যে বিষয়টি বর্তমান বিশ্বকে চমকে দিবে তা হল, তাদের সাথে সাক্ষাতে কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। সাক্ষাতের বিষয়টি সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। বিধর্মীদেরও এই স্বাধীন তা ছিল যে, তারা যখন তখন খলীফার সাথে সাক্ষাত করতে পারত। ইসলামের সাম্যের আরো একটি দিক হল, ইসলাম বর্ণবাদকে সমর্থন করে না। তাই তো হযরত বিলাল আল্লাহর রাসূলের মুআজ্জিন হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিনও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দিয়ে কা’বা ঘরের ওপর আযান দিয়েছিলেন। অথচ হযরত বিলাল রা. ছিলেন কালো বর্ণের একজন হাবশী গোলাম। অপরদিকে কা’বা ঘর জাহেলী যুগেও ছিল সবার নিকট সম্মানিত। তা সত্ত্বেও একজন কৃষ্ণাঙ্গ দাস সেখানে উঠে আযান দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এটিই ছিল ইসলা-ে মর সাম্য। অন্য কোনো জাতি এই দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে পারেনি। সাম্যের এমন অসংখ্য ঘটনা ইতিহ াসের সোনলী পাতায় সংরক্ষিত রয়েছে।

ইসলামের এই সাম্যের বিপরীতে যদি আমরা বর্তমান বিশ্বের সেসব ‘সভ্য’ মানুষগুলোর দিকে তাকাই, যারা নিজেদেরকে সভ্যতা ও মানবতার ধারক হিসেবে উপস্থাপন করে। তাহলে দেখতে পাব যে, একদিকে তারা মানবতার শ্লোগান দেয়, অপর দিকে মানবতাবিরোধী সংগঠনে নেতৃত্ব দেয়। অপরাধ

উদাহরণত ইংল্যাণ্ডের ভূমি আইনের কথাই বলি। সেই আইন অনুসারে সরকার চাইলে যেকোনো ব্যক্তিকে জমি লিজ দিতে পারে। পাঁচহাজার একরের কম জমি নামমাত্র মূল্যে নয়শত নিরানব্বই বছরের জন্য যে কাউকে সরকার প্রদান করতে পারে। এই আইনের ফলে ১৯২৫ সনে হিসেব করে দেখা গেল যে, একজন শ্বেতাঙ্গ গড়ে পাঁচশ একর জমির মালিক। পক্ষান্তরে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির মালিকানায় রয়েছে মাত্র আট একর জমি।

আমেরিকার বর্ণবৈষম্যের চিত্র আরো বিস্ময়কর ও হৃদয়বিদারক। সেখানে নিগ্রোদের প্রতি নির্যাতন ও নিপীড়নের ক্ষেত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমেরিকায় বিশটি রাজ্যে শ্বেতাঙ্গদের সাথে কৃষ্ণাঙ্গদের একই বিদ্যালয়ে পড়ার অনুমতি নেই। রাজ্যের সংবিধানের ২০১৭ ন অনুচ্ছেদে আছে: শিক্ষা-দীক্ষায় শ্বেতাঙ্গদেরকে কৃষ্ণাঙ্গদের থেকে পৃথক রাখতে হবে। অন্যথায় প্রত্যেকের জন্য পৃথক বিদ্যালয় গড়ে তুলতে হবে। আমেররিকার চৌদ্দটি রাজ্যের সিদ্ধান্ত হল, রেলগাড়িতে শ্বেতাঙ্গদেরকে সম্পূর্ণ আলাদা আসনে বসাতে হবে। হাসপাতাল টেলিফোন রুমে 3 শ্বেতাঙ্গদের জন্য ভিন্ন জায়গা বরাদ্দ থাকবে। এমনকি মানসিক রোগীদের ক্ষেত্রেও কৃষ্ণাঙ্গ ও শেতাঙ্গদের মাঝে তারতম্য বজায় রাখতে হবে।

মোটকথা, সবক্ষেত্রেই সেখানে শ্বেতাঙ্গদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং উন্নত সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়। অন্যদিকে লাঞ্ছনা ও অপদস্থতা মাথায় নিয়ে অভাব অনটন ও দারিদ্রের কবলে পড়ে প্রায় পনেরো মিলিয়ন নিগ্রো দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছে। এটি এমন একটি দেশের চিত্র, যারা কিনা জাতিসংঘের নেতৃত্ব দেয় এবং শ্লোগান দেয় যে, তাদের মিশন হল মানুষের মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

১৯৪৭ সালের পরিসংখ্যান বলে যে, শ্বেতাঙ্গদের অসুস্থতার হার তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গদের পাঁচগুণ বেশী। নিউজার্সিতে এই সংখ্যা প্রায় সাতগুণ বেশী। কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের মৃত্যুর হার অন্যান্য শিশুদের তুলনায় সত্তর পার্সেন্ট বেশী। তবে এটাই কি তাদের মানবতা? তাদের সভ্যতা কি তাদেরকে এটিই শিক্ষা দেয়?

স্রষ্টার অমোঘ বিধানে কিছু মানুষ ধনী হয়, আবার কিছু মানুষ হয় দরিদ্র ও অসহায়। কেউ হয় শাসক, আবার কেউ হয় শসিত। কারো গাত্রবর্ণ হয় সাদা, কারো হয় কালো। কালের বিবর্তনে এই ধারা অব্যাহত থাকবে। এতে কোনো পরিবর্তন সাধিত হবে না। তাই বলে ধনী-গরীব, শাসক-শা-ি সত, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গের মাঝে বৈষম্যের কোনো সুযোগ নেই। সকলেই সমান। ব্যবধান যদি থেকে থাকে, তবে তা যোগ্যতা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে। তাই আসুন, বর্ণবাদ ও বৈষম্যকে ঘৃণা করি। ইসলামের সাম্য ও বৈষম্যহীনতার আলো সর্বত্র ছড়িয়ে দেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *