পিঠার গন্ধে ঘুম আসে না।

লেখকঃ আব্দুল্লাহ শাকের

পিঠেপুলির দেশ বাংলাদেশ। পিঠা এ দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। পৌষের হিমেল হাওয়া ছাড়া যেমন শীতকে কল্পনা করা যায় না ঠিক তেমনি পিঠা ছাড়াও বাঙালির ঐতিহ্য ভাবা যায় না।

অগ্রহায়ণ মাসে যখন নবান্নের উৎসব লেগে যায় আমন ধানের মৌ মৌ গন্ধে

সুরভিত হয় আশপাশ। চারপাশ। তবে পৌষ পেরিয়ে মাঘ এলেই শীতকালের আসল পরিচয় পাওয়া যায়। দিনের বেলাতেও কুয়াশাচ্ছন্ন আবছায়ায় শীতকাল জেঁকে বসে। তবে পৌষের প্রাণের ডাকে সাড়া দিয়েই হিম হিম শীতের সকল আয়োজন শুরু হয়ে যায়। শীতকালের আয়োজন মানেই যে পিঠাপুলি! এ দেশে বিশেষকরে পৌষ ও মাঘ মাসে পিঠাপুলির ধুম পড়ে যায়। পিঠাবিহীন শীতকাল যেন কল্পনাই করা যায় না। তাই শীতকালকে পিঠার

মৌসুমও বলা হয়ে থাকে। অপরদিকে বাঙালির লোক ইতিহাস-ঐতিহ্যে পিঠাপুলি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই পিঠাপুলির প্রায় ১৫০টি রকমভেদ থাকলেও আমাদের বাংলাদেশে বর্তমানে মোটামুটি ৩০ প্রকারের পিঠার প্রচলন দেখা যায়। POE

প্রতিটি পিঠা শুধু স্বাদেই অনন্য নয়, এদের এক একটি উপকরণে পরম মায়ার পরশ মাখা থাকে। গায়ের কিশোরী মেয়ে বা লাজুক বধূর আলতা রাঙা পায়ে ঢেঁকি ভাঙানির গান এনে দেয় ধবধবে চালের গুঁড়ো। শীতের হালকা রোদে উঠোনের এক কোনে দু’তিন জনের গল্পে গল্পে নারকেল

কুড়ানো, ঝাপসা মতন কুয়াশা চাদর ভোরে জোগাড় করা খেজুর রস, সেই

নতুন রস থেকে তৈরি পাটালি গুড় আর খাঁটি ঘন দুধ, তেল ইত্যাদি সব উপক

রণের সাথে মায়ের যত্ন আর ভালোবাসা যোগ হলেই মনকাড়া, দৃষ্টিনন্দন অমৃত

স্বাদের পিঠেপুলি জিভে জল আনে।

বেশিরভাগ পিঠা মিষ্টি হলেও সেই মিষ্টি স্বাদ একইরকম নয়। এর কোনটা

রেখে কোনটা বেশি মজাদার তা বলা কঠিন হয়ে পড়ে। যেন একেকটি পিঠা নিজেদের মধ্যে স্বাদের প্রতিযোগিতা করে। শুধু স্বাদই নয়, নামেও এদের বিশেষত্ব রয়েছে। যেমন- গরম ভাপে তৈরি ভাপা পিঠা, সুন্দর নকশা আঁকা হয় বলে নকশী পিঠা, দুধে ভিজে চিতই হয় দুধ

চিতই, লবঙ্গের ঘ্রানে সাজে লবঙ্গ লতিকা, মুঠ পাকিয়ে সেদ্ধ দিলেই মুঠোপিঠ

T। এরকম আরো কত বাহারি নাম! আবার গোলাপ ফুলের আকারে হলে হয় গোলাপ পিঠা। এছাড়াও মুখে রুচি এনে দেয় পাটিসাপটা, কুলি, দুধ কুলি, চিতই, তেলেভাজা, রাজভোগ, ঝিনুক পিঠা, ঝুড়ি পিঠা, চাপড়ি পিঠা, ছিট পিঠা, কলা পিঠা, পাক্ষণ, আন্দশা, মালপোয়া, সেমাই পিঠা, বিয়ের বিশেষ বিবিয়ানা, মেরা পিঠাসহ আরও কত কী! এ ছাড়াও শীতে খাওয়া হয় রস পিঠা, ডিম চিতই পিঠা, দোল পিঠা, কাটা পিঠা, জামদানি পিঠা, হাঁড়ি পিঠা, চাপড়ি পিঠা, চাঁদ পাকান, সুন্দরী পাকান, সরভাজা, পুলি, পানতোয়া, মালপোয়া, মালাই, কুশলি, ক্ষীরকুলি, ঝালপোয়া, সূর্যমুখী, নারকেলি, সিদ্ধপুলি, ভাজা পুলি, দুধরাজ ইত্যাদি। পিঠেপুলির আমেজে মুখরিত হয় শীতকাল। কনকনে শীতকে উপক্ষা করেই

বউ-ঝিয়েরা পিঠা বানানোয় বিভোর হয়। এদিকে মেয়েছেলেদের পিঠার গন্ধে

ঘুম আসে না! শীতকাল ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পিঠার স্থান যেন দেশীয় ঐতিহ্যের স্বকীয়তা ধরে রাখে। পিঠা ধরে রাখে আত্মীয়তার বন্ধন। আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি পিঠা পাঠিয়ে রক্ষা করা হয় আত্মীয়তার বাঁধন। ভালোবাসার অটুট গাঁথুনি। প্রেমে প্রেমে ভরে উঠে সকলের তনুমন। আজকের ব্যস্তসমস্ত জীবনে শহরের ইট-পাথরময়তায় আর সেই গ্রামের মেঠোপথ ধরে ঝাপসা কুয়াশায় পাওয়া যায় না সকালের খেজুরের রস। সূর্যের কোমল মিষ্টি রোদের হাসিতে হয় না। খাওয়া রসের পিঠা। যা ছিল রস টসটসে টইটুম্বুর। তবুও গ্রামের মেঠোপথ,ঘোমটাপরা কুয়াশা, সকালের খেজুর রস, সূর্যের উকি দেয়া কোমল মিষ্টি মিষ্টি সোনারোদ আর মায়ের নরম হাতের পিঠা বানানোর কথা মনে পড়লে কার না প্রিয় চিরচেনা গ্রামে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। সকলেরই ইচ্ছে করে গ্রামে ফিরে যেতে। মায়ের হাতে বানানো পিঠাপুলি খেতে।

তবে নাড়ির টান যে আজো অনুভূত হয় সংস্কৃতি ততে। তাই শহরবাসীদের পিঠার চাহিদা মেটাতে অলিতে গলিতে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসে ছোট ছোট পিঠার দোকান। টাকায় কেনা পিঠাপুলি খেয়েই শহরবাসীরা পিঠা খাবার খায়েশ মেটায়!

বসন্তের আগমন পর্যন্ত চলে পিঠা খাওয়া। আদি নিয়মে মূলত মাঘ মাসে পিঠা খাওয়া শুরু, ফাল্গুনে শেষ। চৈত্রে পিঠা খাওয়া হয়, কিন্তু সেটা আর জমে উঠে না স্বাদে-স্বস্তিতে। সম্ভবত নতুন ধান থেকে তৈরি চালে যে মৌ মৌ আণ আর আর্দ্রতা থাকে, পিঠা বানানোর আটা তৈরিতে সেই চাল বেশ উপযোগী। ধান যত পুরনো হতে থাকে, ততই সে আর্দ্রতা হারাতে থাকে। ফলে সেই চালের আটায় তৈরি পিঠা আর স্বাদে ভরপুর থাকে না আগের মতো। হেমন্তে নতুন ধান উঠে গেলে নারীরা ঢেঁকিতে পিঠার জন্য চালের গুঁড়ি বানিয়ে পিঠা বানাত। কিন্তু সেই ব্যবস্থা উবে গেছে সেই কবে! আধুনিক কালের এত যন্ত্রপাতি রেখে কে যায় মাজা বেঁধে ঢেঁকি চালাতে!!

বাংলাদেশে তৈরিকৃত পিঠা রন্ধন প্রণালি হিসেবে দুই রকমের ভাজা ও ভাপা। এই ভাজা ও ভাপা দুই ধরনের। পিঠা কখনো দুধে চুবিয়ে চুবিয়ে দুধপিঠা আবার কখনো চিনি অথবা গুড়ের শিরায় শিরায় বা খেজুরের রসে রসে ভিজিয়ে রসের পিঠা তৈরি করা হয়। নকশি পিঠা আদতে নকশা করা ভাজা পিঠা। এটিকে দুধ, খেজুরের রস, চিনি বা গুড়ের শিরায় ভিজিয়ে খাওয়া হয়। আবার না ভিজিয়েও খাওয়া যায়।

ভাবি, দিনদিন এসব রসালো দুধালো আর মনোহরী পিঠা সমাজ থেকে লোপ পাচ্ছে! আগের মতো আর এখন মনভরে পেট পুরে খেতে পারি না বর্ণালি পিঠপুলি!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *