রঙিন বসন্তের রাঙা ক্যানভাস

বছর ঘুরে আবারো এসেছিল বসন্ত। বসন্ত চলে যাবার সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। এই ঋতুতে প্রকৃতি রাজকীয় রূপে সজ্জিত হয়। তাই একে বলা হয় ঋতুরাজ। হিমগর্ভ ঠাণ্ডার ঋতু শীতের বিদায়ের পথ ধরে প্রকৃতিতে উঁকি দেয় বসন্তের মিষ্টি হাওয়া। যে হাওয়ার জাদুকরী ছোঁয়ায় প্রকৃতি নেচে ওঠে। শীতকালে গাছের দিকে তাকালে একটা মরা মরা ভাব দেখা যায়। রিক্তপত্র বৃক্ষরাজি অসহায় অবস্থায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। বসন্তের হাওয়ায় সেসব গাছগুলো নতুন পাতার সবুজাভ অবয়বে ঢাকা পড়ে। ফলে চিরসবুজ বাংলার চিরচেনা প্রকৃতি আবারো ফিরে আসে। বসন্তে শত ফুলের বিচিত্র রঙ ও কচি পাতার কাঁপন প্রকৃতিকে আলো ঝলমলে করে তোলে।

ঋতুরাজের শুভাগমনে নানা রঙের ফুলে-ফলে ছেয়ে যায় গাছপালা। লাল ফুল, নীল ফুল, হলুদ ফুল, বেগুনী ফুল, ঘিয়ে ফুল, আকাশি ফুল, সাদা ফুলসহ নাম না জানা বাহারি রঙের ফুল ফোটে বাংলাদেশে। তাই বসন্তের ফুল মানেই রঙের মেলা। টকটকে লাল রঙা শিমুল ফুল কেবল মানুষ নয় পাখিদেরকেও দারুনভাবে আকৃষ্ট করে। আর পলাশ ফুল গাছের শাখায় শাখায় ধরিয়ে দেয়। কমলা আগুন। আবার গাঁদাফুল নিজের আত্মপ্রকাশ ঘটায় বিভিন্ন রঙে। হলুদ, মেরুন ও সাদা রঙে সে মাতিয়ে রাখে প্রকৃতিরাজ্য।

প্রকৃতির এই রাজকীয় সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় গাছ মুকুলে ভরে যায়। রাস্তার পাশে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা আমগাছ মুকুলের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়ে। বসন্তে প্রকৃতির নান্দনিক এই প্রতিচ্ছবি সত্যিই উপমাহীন। এ সময় প্রকৃতি ধারন করে রূপ লাবন্যে ভরা এক মনোহর পরিবেশ। আর মানুষের মনে জাগে হিল্লোলের জোয়ার।

বসন্তে পুষ্পবর্তী গাছগুলোতে ঝিরঝির করে মৃদু বাতাস বইতে থাকে। আম্রকাননের মুকুল আর ফুলবাগানের বিচিত্র সুমিষ্ট ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বাতাস চুষলেই পাওয়া যায় মিষ্টি এক মোহনীয় স্বাদ। পুষ্পমা লার সেই ঘ্রাণে মৌমাছিদের আগমন ঘটে। মৌ-রাণীর নেতৃত্বে তারা গড়ে তোলে মধুভরা মৌচাক। আবার সেই ঘ্রাণে বিমুগ্ধ হয় কুকিলের দল। কুকিলের কুহুতানে উন্মাতাল হয় প্রকৃতি।

হাসছে আকাশ, কাঁপছে বাতাস, রাস্তার দু’ধারে দুলছে আয়মুকুল। পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে আগুনঝরা উচ্ছলতা। এই আমাদের বসন্ত। বসন্ত মানেই পূর্ণতা, বসন্ত মানেই প্রানোচ্ছ্বাস, বসন্ত মানেই নতুন করে জেগে ওঠা। তাই তো এই বসন্তেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বাঙালিরা জেগে ওঠেছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধও হয়েছিল বসত্ত্বেই।

চেতনার এই ঋতুতে তাই আমার স্বপ্নজগত নতুন করে জেগে ওঠে। সেই স্বপ্নজগতে কৃষ্ণচূড়া ঝরা হলুদাভ পথে পলাশের লালিমা মেখে আমি এগিয়ে যাই লাল নীল বিচিত্র সব স্বপ্নপূরনের পথে। তাই মহান প্রভুর নিকট প্রার্থনা করি বাংলার ঋতুচক্রে বসন্ত রয়ে যাক চিরকাল…!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *