মাদরাসাপড়ুয়াদের কর্মসংস্থান ও অর্থের অনর্থ

মাদরাসাপড়ুয়াদের কর্মসংস্থান ও অর্থের অনর্থ

লেখকঃ জহির উদ্দিন বাবর

দেশের কওমি মাদরাসাগুলো থেকে প্রতি বছর ২০ হাজারের বেশি আলেম ফারেগ হচ্ছেন। দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করার পর বেশির ভাগই কোনো খেদমতে নিয়োজিত হন। সাধারণত মাদরাসাপড়ুয়াদের কর্মক্ষেত্র মসজিদ-মাদরাসা কেন্দ্রিকই। শতকরা প্রায় ৯০ জনই কোনো মসজিদ কিংবা মাদরাসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। অনেকে পাশাপাশি কিছু একটা করেন। ফারেগ হওয়ার পর কর্মক্ষেত্র হিসেবে মসজিদ মাদরাসার বাইরের কোনো অঙ্গন বেছে নেন এমন সংখ্যাটা খুবই কম। তবে আগের তুলনায় এই সংখ্যাটা বেড়েছে। একটা সময় মাদরাসায় পড়াশোনা করে। মসজিদ-মাদরাসার বাইরে কোনো কর্মক্ষেত্র বেছে নিলে কিছুটা বাঁকা চোখে দেখা হতো। ভাবা হতো, হয়ত তার ইলম-কালাম তেমন নেই, এজন্য দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত হতে পারেনি। তবে এখন অনেকেই বাইরের জগতের সঙ্গে জড়ানোর কারণে চিরাচরিত দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। আকিদা-বিশ্বাস ও চেতনার জায়গাটি অক্ষুণ্ণ থাকলে এবং লেবাস পোশাক ও অবয়বে কোনো দৃষ্টিকটু পরিবর্তন না এলে বাইরের কোনো কর্মক্ষেত্র বেছে নেয়ায় দোষের কিছু নেই। বরং যারা মাদরাসায় পড়াশোনা করে বাইরের কোনো কর্মক্ষেত্রে বেছে নিতে পারছেন সেটা তাদের কৃতিত্ব। তারা তাদের যোগ্যতা দ্বারাই সেখানে নিজের অবস্থান করে নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে আলেম-ওলামার প্রতি জনসাধারণের একটি জায়গায় আটকে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা পরিবর্তন হবে। আলেমরা সুযোগ পেলে সবখানেই তাদের যোগ্যতা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারেন সেটা প্রমাণিত হচ্ছে। যিনি বাইরের জগতের সঙ্গে যুক্ত হলেন পরোক্ষভাবে তিনি মসজিদ-মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের ওপর অনুগ্রহ করলেন। কারণ তিনি বাইরের কর্মক্ষেত্র বেছে না নিলে মসজিদ-মাদরাসায় একটি আসন দখল করতেন। এখন সেই আসনটিতে তার আরেক ভাই বসতে পারছে। প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার ছাত্র/ছত্র কওমি মাদরাসা থেকে ফারেগ হলেও সেই অনুপাতে কর্মক্ষেত্র কিন্তু তৈরি হচ্ছে না। ফলে এই অঙ্গনে একটা বাড়তি চাপ তো রয়েছেই। এই বাড়তি চাপ মোকাবেলায় বাইরের কর্মক্ষেত্রের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার সময় এসেছে। আসলে মসজিদে ইমামতি কিংবা মাদরাসায় পড়ানোর জন্য কত আলেমের প্রয়োজন? আমি মনে করি বর্তমানে যে হারে ফারেগ হচ্ছে তাতে সেই প্রয়োজন মিটিয়েও অনেক উদ্বৃত্ত থাকে। অতিরিক্ত যারা তাদেরকে বাইরের কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। নিজের আমল-আখলাক ঠিক করে, চিন্তা-চেতনার জায়গাটিতে কোনো আপস না করে নবীন আলেমরা যেকোনো পেশাতে জড়াতে পারেন।

গত ১০/২০ বছরে মাদরাসা পড়ুয়াদের মধ্যে বাইরের জগতের সঙ্গে জড়ানোর প্রবণতা যথেষ্ট বেড়েছে। যারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন তারা ভালোও করছেন। অনেকে আবার মসজিদ-মাদরাসার খেদমত ঠিক রেখে বাইরের ব্যস্ততা বাড়িয়ে দিয়েছেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটা ভালো দিক। আলেম-ওলামার ব্যাপক হারে ব্যবসায় আসা উচিত আল্লাহর রাসুল ও সাহাবায়ে কেরাম ব্যবসা করেছেন, নবী-রাসুলেরা ব্যবসা করেছেন, অনেক বড় বড় বুজুর্গ ব্যবসা করেছেন; সেই সুন্নতটি বাঁচিয়ে রাখার জন্য হলেও অন্তত কিছু আলেমকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়ানো উচিত। আলেমরা যে সততা,বিশ্বস্ততা ও আমানতদারিতার সঙ্গে ব্যবসা করবেন সেটা দ্বীন সম্পর্কে ধারণা নেই এমন একজন মানুষের কাছে আশা করা যায় না। এজন্য ফারেগিনদের একটি অংশকে ব্যবসার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা উচিত। যাদের ব্যবসার প্রতি ঝোঁক আছে তাদের উচিত, সম্ভব হলে মাদরাসায় বিনা বেতনে পড়িয়ে ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জন করা। এতে আত্মতৃপ্তি যেমন অর্জিত হবে। তেমনি উপকৃত হবে পুরো ইসলামি অঙ্গন।

মাদরাসা ফারেগিনদের অনেকেই হজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। আল্লাহর ঘরের মেহমানদের খেদমতের উদ্দেশে এই কাজে জড়ানো খুবই প্রশংসনীয়। যারা সঠিকভাবে হাজিদের সেবা করছেন তারা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যবান। একদিকে আল্লাহর ঘরের মেহমানদের সেবা করার সুযোগ হয় অন্যদিকে নিজে বারবার মুমিনের স্বপ্নের জায়গা মক্কা-মদিনায় যাওয়ার সুযোগ হয়। আল্লাহর ঘর এবং নবীজির রওজা মোবারকে বারবার হাজির হওয়ার সৌভাগ্য নসিব হয়। আর্থিকভাবে লাভবান না হলেও এই সুযোগটিও অনেক বড় প্রাপ্তি। আলেম-ওলামার অনেকেই হয় ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত হওয়ার কারণে হজযাত্রীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সেবা সর্বোপরি আলেমদের পাচ্ছেন। কারণে সর্বসাধারণ বিশুদ্ধভাবে হজ ও উমরা পালনের সুযোগ পাচ্ছেন।

তবে হজকেন্দ্রিক সেবার পাশাপাশি বাণিজ্যের খবরও প্রায়ই পাওয়া যায়। হজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত হওয়াটাকে আজকাল ব্যবসা হিসেবে মনে করা হয়। ব্যবসায়িক মনোভাবের আর কারণে সেখানে সেবার চেয়ে মুনাফা লাভের প্রতিই মনোযোগটা বেশি থাকে। সাধারণ একজন মানুষ আর একজন আলেমের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য থাকা উচিত। কিন্তু হজবাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত আলেমরা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের শিক্ষা ও আদর্শের পরিপন্থী কাজ করে বসেন। এমনকি হজযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগও পাওয়া যায় অনেকের বিরুদ্ধে। যদিও এই সংখ্যাটা কম। তবে এই অল্পসংখ্যক আলেমরাই পুরো অঙ্গনকে কলুষিত করছেন। হজকেন্দ্রিক প্রতারণার সঙ্গে একজন আলেমের সম্পৃক্ততা প্রকাশ পেলে গোটা আলেমসমাজেরই নাককাটা যায়। এজন্য নতুন আলেম যারা হজকেন্দ্রিক সেবার সঙ্গে জড়াবেন দয়া করে আলেমসমাজকে কলুষিত করবেন না। আলেম-উলামার বদনাম হয় এমন কিছু করবেন না। প্রয়োজনে না খেয়ে থাকবেন তবুও হজযাত্রীদের সঙ্গে ন্যূনতম প্রতারণা করে টাকা কামানোর চেষ্টা করবেন না। মনে রাখবেন, হজ ও উমরাযাত্রীরা আল্লাহ ও তার রাসুলের মেহমান, তাদের সঙ্গে যেকোনো ধরনের প্রতারণা ও খেয়ানত সরাসরি আল্লাহ রাসুলের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। একজন আলেম তো দূরের কথা, গণ্ডমূর্খ কেউই এমন দুঃসাহস করতে পারে না।

 

অর্থ মানুষের জীবনের অপরিহার্য অনুসঙ্গ। আমরা যতই অর্থই সব অনর্থের মূল’ বলে বেড়াই দিনশেষে আমরা অর্থের পেছনেই দৌড়াই। অর্থ ছাড়া এই সমাজে কিছুই হয় না। এমনকি দীনের খেদমতও এখন অনেকটা অর্থের ওপর নির্ভর হয়ে গেছে। অর্থের যোগান থাকলে আপনি যত সহজে দ্বীনি খেদমত করতে পারবেন সেটা অর্থের টানাপোড়েন থাকলে পারবেন না। অর্থ থাকলে আপনি পরিবার থেকে নিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে যেভাবে মূল্যায়িত হবেন সেটা অর্থ না থাকলে কল্পনাও করা যাবে না। এজন্য আলেম-ওলামার মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী একটি শ্রেণি হয়ে উঠুক সেটা সবার প্রত্যাশা। কিন্তু সেই অর্থের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে কখনও দীন-ধর্ম সর্বোপরি আপনি যে ইলম শিখে এসেছেন সেটার বিসর্জন দেয়া যাবে। না।

একটা সময় আমাদের আকাবিররা অর্থনৈতিক ব্যাপার-স্যাপার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতেন। মূলত তাদের ইখলাস ও লিল্লাহিয়াত ছিল সেই মাপের। তাদের সঙ্গে এখনকার আলেম-ওলামার কোনো তুলনাই চলে না। তাছাড়া সময়ের পরিবর্তনে সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। এখনকার সমাজ পারিপার্শ্বিকতাই আমাদেরকে অর্থনৈতিক বিষয়াদির প্রতি জোর দিতে তাড়িত করে। অর্থকড়ি, সহায়-সম্পত্তি এগুলো আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও দান। অনেকে শত চেষ্টা করেও অর্থ-সম্পদের মালিক হতে পারে না। আবার অনেককে কোনো চেষ্টা-তদবির ছাড়াই অঢেল সম্পদ দান করেন। একজন দুনিয়াদারের মতো অর্থের পেছনে দৌড়ানো কখনও আলেমের শান হতে পারে না। এজন্য আলেম-ওলামার মধ্যে যারা অর্থকড়ির মালিক হবেন কিংবা মালিক হওয়ার চেষ্টা করবেন তাদের এই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

অর্থনৈতিক বিষয়াদিতে জড়াতে গিয়ে আলেম-ওলামাদের অনেকেই বদনামের ভাগিদার হয়েছেন এমন ঘটনা আমাদের চোখের সামনেই ঘটেছে। একটা সময় নবীন আলেমদের কেউ কেউ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান করার দিকে হঠাৎ করে মনোযোগী হলেন। রাতারাতি তারা গড়ে তুললেন বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। সাধারণের কাছ থেকে বিনিয়োগ এনে তারা বিপুল অংকের প্রতিষ্ঠান গড়েও তোলেন। হঠাৎ তাদের এই উত্থান দেখে অনেকে আশাবাদী হয়েছিলেন। এবার আলেমদের অর্থের সংকট দূর হয়ে যাবে এমন সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠেছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই তারা আর্থিক খাতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেন। জনসাধারণ থেকে আনা টাকাপয়সার সঠিক হিসাব পর্যন্ত অনেকে দিতে পারেন না। আর্থিক খাতে কথিত কিং হয়ে ওঠা সেই আলেমদের অনেকেই আজ দৃশ্যপটের বাইরে। কান পাতলেই শোনা যায় তাদের অবিশ্বস্ততা, খেয়ানত আর গাদ্দারির কাহিনি। তাদের এই অপেশাদারি ও বে-দ্বীনি আচরণ দেখে অনেকে বলতে বাধ্য হয়েছেন, আলেম-ওলামার জন্য এই অর্থনৈতিক বিষয়াদি নয়।

অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান করতে গিয়ে আলেমদের যারা ব্যর্থ হয়েছেন তাদের সবাই যে অবিশ্বস্ত কিংবা খেয়ানতকারী- এমনটা নয়। মূলত অপরিচিত একটি অঙ্গনে যাত্রা করতে গিয়ে তারা হোঁচট খেয়েছেন। তবে তারা হোঁচট খেয়েছেন বলেই যে অন্যেরা এই অঙ্গনে চলতে পারবেন না এমনটা নয়। ফারেগ হওয়ার পর যাদের এ ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে জড়ানোর টার্গেট থাকে তাদের এ ব্যাপারে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করতে হবে। অনেক বেশি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হবে। পুরোপুরি জানাশোনা থাকলে এবং দীনদারি ও আমানতদারি বজায় রেখে কাজ করলে ব্যর্থ হওয়ার

কোনো কারণ নেই। তবে ইলমে নববীর নূরানি আবহে যারা দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন; দ্বীনি ইলমের আলোয় যারা আলোকিত তাদের উচিত পার্থিব এমন কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত না হওয়া যা পুরো অঙ্গনকে কলুষিত করে। মনে রাখবেন, আপনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো দোষ করলেও এর দায় বর্তাবে গোটা আলেম সমাজের ওপর। এজন্য প্রতিটি পদক্ষেপে সাবধানতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই।

1 thought on “মাদরাসাপড়ুয়াদের কর্মসংস্থান ও অর্থের অনর্থ”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *