মুকুটহীন বাদশার ঈর্ষণীয় বিদায়

জহির উদ্দিন বাবর

জীবনের নিয়তিই চলে যাওয়া। পৃথিবীর শুরু থেকে এই চলে যাওয়ার মিছিল অব্যাহত আছে। তবে কিছু কিছু চলে যাওয়া দাগ কেটে যায় সবার অন্তরে। সৃষ্টি করে গভীর এক শূন্যতা যা কোনে- ভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। গত ২৯ জানুয়ারি ২০২০ এমনই একজনের চলে যাওয়া আমরা দেখলাম যে চলে যাওয়া ক্ষত সৃষ্টি করেছে কোটি হৃদয়ে। অশ্রু ঝরিয়েছে অগণিত চোখে। নীরব কান্নায় ভাসিয়েছে আপন-পর সবাইকে। হ্যাঁ, বলছিলাম হজরতুল আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ রহ.-এর কথা। তিনি মানুষের কতটা প্রিয় ছিলেন সেটা জীবদ্দশায় তেমন টের না পেলেও চলে যাওয়ার পর পুরোপুরিই টের পাওয়া গেছে। মুকুটহীন এই বাদশার ঈর্ষণীয় বিদায় দেখে অগণিত হৃদয়ে সুপ্ত তামান্না জেগেছে, আহ! আমার বিদায়টিও যদি এমন হতো!

সবার প্রিয় শাহ সাহেব হুজুরের বিদায়ী দৃশ্যটি কেমন ছিল সেটা শোকাহত সেই মিছিলে যারা শরিক হয়েছিলেন তারা ভালো বলতে পারবেন। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে দেশ-বিদেশের অনেকেই সেই দৃশ্য কিছুটা হলেও দেখেছেন। ছোট্ট শহর কিশোরগঞ্জ সেদিন ভারী শোকে কাতর হয়ে পড়েছিল। ইতঃপূর্বে কখনও কিশোরগঞ্জ এতোটা শোকাহত হয়েছে বলে মনে পড়ে না। দেশের নানা প্রান্ত থেকে সেদিন ছুটে এসেছিলেন লাখো জনতা তাদের প্রিয় মানুষটিকে শেষ বিদায় জানাতে। গভীর রাতে তাঁর লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি যখন প্রিয় অঙ্গন

জামিয়া ইমদাদিয়ার গেইট দিয়ে ঢুকছিল তখন সেখানকার কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাত স। কনকনে শীত উপেক্ষা করে শহরের হাজারও মানুষ ভিড় করেন শেষবারের মতো প্রিয় শাহ সাহেব হুজুরকে একবার দেখতে। আর মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের হৃদয়ভাঙা আকুতি কেমন ছিল সেটা প্রকাশ করার মতো ভাষা নেই। ঐতিহাসিক শোলাকিয়ার ময়দানে লাখ লাখ জনতার শোক ও কান্নার মিছিল ছিল সবচেয়ে বেদনার দৃশ্য। কারও বিদায়ী যাত্রায় এতো মানুষের সমাগম এর আগে কিশোরগঞ্জবাসী দেখেনি। দেশের ইতিহাসে এতো বড় জানাজা খুব কমই হয়েছে। শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে যত লোক হয় এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ছিল সেদিনের উপস্থিতি। শেষ পর্যন্ত জানাজায় কাতারের মাঝখানে কোনো জায়গা ফাঁকা না রেখে চাপাচাপি করে দাঁড়াতে হয় সবাইকে। এরপরও ইমামের সামনে হাজার হাজার লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এই ভিড় সামাল দিতে স্থানীয় প্রশাসনকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে।

দেশের শীর্ষ পর্যায়ের আলেম-উলামার সিংহভাগ সেদিন ছুটে গিয়েছিলেন ঐতিহাসিক শোলাকিয়া মাঠে। সবার চোখে-মুখে ছিল অতি আপনজন হারানোর অভিব্য । জানাজাপূর্ব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সেটা অনুভব করা গেছে। শাহ সাহেব হুজুর দেশের আলেম-উলামা, বিশেষ করে কিশোরগঞ্জবাসীর জন্য কত বড় নেয়ামত ছিলেন সবার বক্তব্যে উঠে আসে সেই অভিব্যক্তি। তাঁর শূন্যতা পূরণ হওয়ার মতো নয় এমনটাই ছিল সবার বক্তব্যের সারসংক্ষেপ। রত্নতুল্য এই মানুষটিকে হারানোর আক্ষেপ ছিল সবার কণ্ঠে।

দুই, শাহ সাহেব হুজুর ছিলেন তাঁর ছাত্রদের কাছে স্বপ্নপুরুষ, সবচেয়ে বড় হিরো। ছোটবেলা থেকে বড় আলেম বলতে আমরা তাঁকেই দেখে এসেছি। বড় হয়ে তাঁর মতো হবো-এমন একটা সুপ্ত বাসনা প্রতিটি ছাত্রের মধ্যে কাজ করতো। কথাবার্তা, এজন্য শাহ চলন-বলন, সাহেবের অঙ্গভঙ্গি সবকিছুই তাঁর ছাত্ররা অনুসরণ-অনু করণ করার চেষ্টা করতো। তিনি ছিলেন একজন কেতাদুরস্ত সৌখিন মানুষ। মাড় দেয়া সুতি কাপড়ের সাদা পাঞ্জাবি পরতেন। সামান্য কুচকে যাওয়া পাঞ্জাবি তাঁর গায়ে কোনোদিন দেখিনি। লুঙ্গি পরে বাসা থেকে বেরিয়েছেন এমন দৃশ্য দেখেছি বলে মনে পড়ে না। মেহেদিযুক্ত চুল-দাড়ি ছিল বেশ আকর্ষণীয় তাঁর পান খাওয়ার দৃশ্যটাও ছিল বেশ চমৎকার। এতোটা আর্ট করে কথা বলতে খুব মানুষকে দেখেছি। তাঁর হাঁটার ভঙ্গিতেই ছিল একটা শাহি ভাব। নিজের গাড়ি ছিল, তবে বেশির ভাগ

সময়ই শহরের রথকলার বাসা থেকে জামিয়া ইমদাদিয়া কিংবা শহীদি মসজিদে আসা আসতেন রিকশায় করে। ছোট্ট শহরের ব্যস্ততম এলাকা দিয়ে রিকশায় করে যখন তিনি আসা আসা-যাওয়া করতেন তখন মানুষ শুধু তাকিয়ে তিন. তাঁকেই দেখত। হাজারো মানুষের মধ্যে তাঁকে মনে ব্যতিক্রমী কেউ। ব্যক্তিত্বে ভরা হতো নূরানি চেহারাটি সবার দৃষ্টি কাড়ত। যারা জীবনে কোনোদিন তাঁকে দেখেনি, তাঁকে চিনেন না তারাও ভক্তিতে গদগদ হয়ে তাঁর প্রতি সালাম বর্ষণ করতো। তাঁর আসা-যাওয়ার দৃশ্যটি যারা দেখেছেন তারা জানেন, মনে হতো কোনো রাজা-বাদশা কিশোরগঞ্জ শহর পেরোচ্ছেন। আর সবাই মুগ্ধ হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। এমন শানদার ও ঈর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী আলেম আমাদের সমাজে সচরাচর চোখে পড়ে

জামিয়া ইমদাদিয়ার গেইট দিয়ে তিনি। ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পুরো ক্যাম্পাসের দৃশ্যপট পাল্টে যেত। তিনি কাউকে ধমক দিতেন না, শাসাতেন না, তবুও তাঁর উপস্থিতিটাই সবকিছু পাল্টে

ফেব্রুয়ারী ২০ ইং

দিতো। ছাত্র-শিক্ষক সবাই নিজ নিজ কর্তব্যে মনোযোগী হতে যেতেন। তাঁর মধ্যে রু’ব বা শ্রদ্ধামিশ্রিত এমন একটা ভয় ছিল যা সবাইকে সমানভাবে ছুঁয়ে যেতো। দরস চলাকালে তিনি মাঝে মাঝে পরিদর্শনে বের হতেন। বিশাল বিল্ডিংয়ের এক প্রান্ত দিয়ে তিনি হাঁটা আজ শুরু করলে সব ক্লাসে খবর হয়ে যেতো শাহ সাহেব আসছেন। সত্যিকারের একজন মুহতামিম বা প্রিন্সিপাল ছিলেন তিনি। তাঁর মতো এতোটা প্রভাবশালী কোনো মুহতামিম আমার চোখে পড়েনি।

অত্যন্ত রুচিশীল একজন ছিলেন। তাঁর সবকিছুতেই রুচির একটা ছাপ ছিল। ব্যক্তিগতভাবে যেমন একজন রুচিবান, সুশৃঙ্খল, পরিপাটি মানুষ ছিলেন চাইতেন সবখানেই যেন এটা ফুটে ওঠে। এজন্য তাঁর পরিচা লনাধীন জামিয়া ইমদাদিয়া ও শহীদি মসজিদসহ সব প্রতিষ্ঠানে একটা রুচি-বৈচিত্র্যের ছাপ অনুভব করবেন। বিশৃঙ্খলা তিনি একদম দের উদ্দেশে পছন্দ করতেন না। ছাত্রদের নসিহতকালে শৃঙ্খলাবোধের প্রতি বেশি জোর দিতেন। দেশ-বিদেশে যেখানে যেতেন ভালো কিছু দেখলে সেটা নিজের প্রতিষ্ঠানেও কার্যকর করার একটা চেষ্টা থাকত। থানভি সিলসিলার একজন বুজুর্গ হিসেবে শৃঙ্খলাবোধটা তাঁর মধ্যে গভীরভাবে লক্ষ্য করা যেতো।

মুজাহিদে মিল্লাত মাওলানা আতহার আলী রহ.-এর সুযোগ্য সন্তান ছিলেন শাহ সাহেব রহ.। বড় হয়েছেন শাহ একজন জাতীয় নেতা, মন্ত্রী ও এমপির সন্তান হিসেবে। সে হিসেবে তাঁর স্বভাবে, চলনে-বলনে একটা খান্দানি ভাব লক্ষ্য করা যেতো। দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনেক প্রশস্ত। চিন্তার পরিসীমাও ছিল বিস্তৃত। ভাবতেন অনেকের চেয়ে ভিন্ন করে, ধারণ করতেন সময়কে। এজন্য আলেম-উলামার মজলিসে যখন কথা বলতেন সবার চেয়ে আলাদা হতো তাঁর বক্তব্য। ইলমি গভীরতা, বর্ণাঢ্য জীবনের অভিজ্ঞতা ও তীষ্ম বুদ্ধিমত্তার কারণে তিনি সবার দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হতেন। এজন্য গত প্রায় চার দশক ধরে তিনি জাতীয় পর্যায়ের আলেমদের মধ্যে অনন্য অবস্থানে ছিলেন। শীর্ষ আলেমদের যেকোনো উদ্যোগে তাঁর উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। কোনো

রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হওয়ার কারণে তিনি ছিলেন সবার চোখের – বলতে তিনি সমান গুরুত্ব পেতেন। জাতীয় প্রতিষ্ঠান বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া যাদের শ্রম-ঘাম আর মেধায় আজকের পর্যায়ে তাদের অন্যতম ছিলেন শাহ সাহেব হুজুর রহ.। তিনি প্রতিটি মিটিং প্রাণবন্ত ও কার্যকরী সহসভাপতি করার মূল কারিগর ছিলেন তিনি। যেসব মিটিংয়ে শাহ সাহেব থাকতেন না সেগুলো কতটা প্রাণবন্ত ও কার্যকরী হতো না বলে জানিয়েছে মানুষ সংশ্লিষ্টরা। বেফাককে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার পেছনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কওমি মাদরাসা সনদের স্বীকৃতির যে প্রক্রিয়া সেখানেও তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। অনেক টেকনিক্যাল বিষয় তিনি যতটা বুঝতেন ততটা বোঝার মতো লোক যে কেউ খুব কমই আছে। এজন্য সবার কাছে তাঁর বিশেষ ছিল। তাঁর যেকোনো মতকে সবাই শ্রদ্ধা করতেন, কেত দিতেন।

জাতীয় পর্যায়ে যেকোনো সম্মিলিত কাজে তাঁকে সামনের সারিতে দেখা যেতো। বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন-সংগ্রামেও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। বাবরি মসজিদ লংমার্চ, তসলিমা নাসরিনবিরোধী আন্দোলন, ফতোয়াবিরোধী রায়ের বিরুদ্ধে নারীনীতির বিরুদ্ধে নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সবখানেই তিনি সরব ভূমিকা পালন করেন। সবশেষ তাবলিগ জামাত নিয়ে যে সংকটের সৃষ্টি হয় সেখানেও আলেম-উলামার পক্ষে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। শহীদি মসজিদের খুতবায় তিনি এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

চার, পৈত্রিক সূত্রে তিনি সিলেটের মানুষ। তবে তাঁর জন্ম কিশোরগঞ্জে। শহীদি মসজিদের দোতলায় ছিল আতহার আলী রহ.-এর বাসা, সেখানেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। এজন্য জীবনের পুরোটাই আবর্তিত হয়েছে কিশোর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি ছিল, কিন্তু তিনি কিশোরগঞ্জের মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে গিয়েছিলেন। মায়াবি এই শহরেই কেটেছে তাঁর পুরো জীবন বাবার হাতে গড়া জামিয়া ইমদাদিয়া আর শহীদি মসজিদই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। আশির দশকের শুরু থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন জামিয়া ইমদার্নিয়ার মুহতামিম আর শহীদি মসজিদের খতিব ও মুতাওয়াল্লি। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইট-পাথরের সঙ্গে মিশে আছে শাহ সাহেব রহ.-এর শ্রম ও সাধনা।

কিশোরগঞ্জসহ গোটা ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের অভিভাবক ছিলেন শাহ সাহেব রঙ। এই অঞ্চলের বিষয়াদি তাঁর নেতৃত্বেই আবর্তিত হতো। যেকোনো দীনি প্রতিষ্ঠানে সংকটের সৃষ্টি হলে সবাই শরণাপন্ন হতেন শাহ সাহেব রহ.-এর। আর কিশোরগঞ্জ জেলাজুড়ে ধর্মীয় অঙ্গনে শাহ সাহেবের চাওয়ার বাইরে কিছু হওয়ার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। কোনো ব্যাপারে শাহ সাহেব বলেছেন সেটার বিপরীত করার মতো হিম্মত এই জেলায় কারও ছিল না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর শাহ সাহেবের একচেটিয়া প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। সবাই তাঁকে অভিভাবক হিসেবে অসম্ভব মানত, তাঁকে শ্রদ্ধার অনন্য মণিকোঠায় স্থান দিতো।

সাধারণত আলেম-উলামার প্রভাব মসজিদ-মাদরাসাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন শাহ সাহেব রহ। কিশোরগঞ্জের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও শাহ সাহেব বুহু এর প্রভাব ছিল অবিশ্বাস্য রকমের। স্থানীয় প্রশাসন তাঁকে অসম্ভব সমীহ করতো। জামিয়া ইমদাদিয়ার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পদাধিকার বলে জেলা প্রশাসক মজলিসে আমেলার সভাপতি হন। এজন্য যখন যে জেলা প্রশাসক কিশোরগঞ্জে এসেছেন তিনিই শাহ সাহেবের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়েছেন। শাহ সাহেবের ভক্ত নন এমন কোনো ডিসি আজ পর্যন্ত কিশোরগঞ্জে আসেন নি। যেহেতু তিনি রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না এ আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছে তিনি ছিলেন অনেক প্রিয়। সবাই তাকে শ্রদ্ধা ও সমীহ করতো। এমনকি যারা ধর্মকর্মের ধার ধারেন না তাদের কাছেও প্রিয় ছিলেন শাহ সাহেব হুজুর। কিশোরগঞ্জের সাধারণ অসাধারণ শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে তাঁর

ফেব্রুয়ারী ২০ ইং

অবস্থান ছিল অনন্য শ্রদ্ধা ভালোবাসার। সর্বমহলের এতোটা ভালোবাসার মানুষ নিকট অতীতে কিশোরগঞ্জে আসেননি এবং ভবিষ্যতে আসবে কি না তাতে যথেষ্ট হ আছে। তিনি সবার কতটা ভালোবাসার ছিলেন সেটা তাঁর জানাজায় লাখ লাখ লোকের উপস্থিতি দেখেই টের পাওয়া গেছে।

পাঁচ

কিছু গুণের কারণে শাহ সাহেব ছিলেন মানুষের অত্যন্ত প্রিয়। বিশেষ করে তাঁর তেলাওয়াত ছিল খুবই মধুর। তাঁর তেলাওয়াত শুনে কেউ মুগ্ধ না হয়ে থাকতে পারতেন না। তিনি যখন তেলাওয়াত করতেন তখন মনে হতো প্রতিটি শব্দ যেন আসমান থেকে এইমাত্র অবতীর্ণ হচ্ছে। মাহফিল- পাতে তाँর বয়ানের চেয়েও তেলাওয়াত বেশি শুনতে চাইতেন শ্রোতারা। দীর্ঘদিন শহীদি মসজিদে রমজানে একা বিশ রাকাত তারাবি পড়িয়েছেন। তॉর মাধুর্যপূর্ণ তেলাওয়াতের কারণে তারাবির কোনো কষ্টই অনুভূত হতো না। একটা সময় মাঝে মাঝে ফজরের নামাজেও তিনি ইমামতি করতেন। সেই তেলাওয়াতটি ছিল আরও বেশি আকর্ষণীয় ও মুগ্ধতায় ভরা। যারা একবার শাহ সাহেব হুজুরের তেলাওয়াতের স্বাদ পেয়েছেন তারা বারবার শহীদি মসজিদে ছুটে আসতেন তাঁর পেছনে নামাজ পড়ার जमा

জীবনে দেশে-বিদেশে অনেক মসজিদে জুমা পড়েছি। কিন্তু শাহ সাহেবের মতো এতো প্রাণবন্ত কোনো খতিবের দেখা আজ পর্যন্ত পাইনি। তাঁর অন্যান্য আলোচনার চেয়ে জুমার নামাজের পূর্বের আলোচনা অনেক বেশি গোছাে লা, তথানির্ভর ও উপকারী হতো। একদম তাজা सा নিয়ে কুরআন-হাদিসের আলোকে অসাধারণ বয়ান করতেন ইলমি ভাণ্ডারের কোনো কমতি ছিল না। আর বলার ভঙ্গিও ছিলও অসাধারণ। বিশুদ্ধভাষী মতিন খুব কমই চোখে পড়ে আর খুতবায় ছিল তাঁর একটা বিশেষ স্টাইল আরবি স্টাইলে প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করতেন। ধ্বনির উঠা-নাম অন্যরকম এক ব্যঞ্জনা এনে দিতো সেই খুতবায় দ্বিতীয় খুতবায় ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য যে দোয়াগুলো প্রতিটি করতেন সেটা সাধারণত কোনো লেখক: হজরত আযহার আলী আনে খতিবের খুতবায় পাওয়া যায় না। Tয়ার শাহ রহ.-এর গুণমুগ্ধ হার

সবমিলিয়েই তিনি ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী খতিব।

শাহ সাহেবের পেছনে জুমা পড়তে সকাল ১০টা থেকেই লোকজন আসতে থাকত শহীদি মসজিদে। জুমার আজানের আগেই মসজিদ তরে যেতো কানায় কানায়। গায়ে জড়ানো হলু আবা আর সাদা পাগড়ি পরা কাঙ্ক্ষিত খতিব যখন মেহরাবের ভেতরের ছোট্ট দরজাটি খুলে ঢুকতেন তখন শহীদি মসজিদের মুসল্লিদের মধ্যে অন্যরকম এক চাঞ্চল্য বিরাজ করতো। মনে হতো তারা সাত আসমানের তারার সন্ধান পেয়ে গেছে। চারদিকে বিরাজ করতো পিনপতন নীরবতা। হজর সাধারণত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বয়ান করতেন। প্রায় আধাঘন্টার বয়ানে তিনি তুলে ধরতেন ইসলাম, দেশ, জাতি ও আন্তর্জাতিক নানা প্র মুসল্লিদের ব্যাপক চাওয়ার কারণে দেশের যেকোনো প্রান্তে প্রোগ্রাম থাকুক, তিনি জুমা পড়ানোর জন্য ছুটে আসতেন। সিলেটের হজরত শাহজ লাল দরগা মসজিদে মাসে এক হু পড়াতেন। যেদিন শহীদি মসজিে তিনি জুমা পড়াতেন না সেদিন চার দিকে যেন একটা শূন্যতা বিরাজ করতো। প্রিয় সেই খতিবকে কিশোর গঞ্জবাসী এখন প্রতি ঘুমাতেই খুঁজে বেড়াবে। অনুভব করবে তাঁর গভীর শূন্যতা। যে শূন্যতা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়

“একজন আলেমের মৃত্যু আলমের মৃত্যু হাদিসের এই বাক্যটি কতটা যথার্থ সেটা আঁচ করা যায় শাহ সাহেব হুজুরের চলে যাওয়ার ক্ষত থেকে। যত শোকগাথাই রচিত হোক, যত অই বিসর্জন দেয়া হোক, আক্ষেপ আর আকুতি যতই প্রকাশ করা হোক, তাঁর শূন্যতার গভীরতা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। যে অনন্য উচ্চতায় ছিল তাঁর অবস্থান, বহুমাত্রিক যোগ্যত কি যে করণ তিনি ঘটিয়ে গেছেন বর্ণাঢ্য জীবনে; যে কীর্তিগাথা তিনি রচনা করে গেছেন পদে পদে সেখান পর্যন্ত পৌঁছার মতো কাউকে আপাত দৃষ্টিতে চোখে পড়ছে না। তবুও আল্লাহ সবকিছুর ওপর শক্তিমান: छिमि চাইলে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন। আমরা শুধু দোয়া করি, আল্লাহ শাহ সাহেব হুজুরের শূন্যতা পূরণ করে দিন। আর তাকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন। আমিন।

1 thought on “মুকুটহীন বাদশার ঈর্ষণীয় বিদায়”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *