খিদমাতে খালক সৌভাগ্যের সোপান।

মানবতার সূচনালগ্ন থেকেই পৃথিবীতে দু’ধরে নর মানুষের বসবাস। এদের মাঝে এক দল হচ্ছে ধনি। পৃথিবীতে যাদের আগমন ঘটে অনাবীল সুখ আর আনন্দ নিয়ে, ক্ষুধার কষ্ট ও অমানিশা নিয়ে। না খেয়ে থাকার যন্ত্রণা যাদের কাছে থাকে চির অপরিচিত। তারা জানে না কাকে বলে স্বাদ আর কাকেই বা বলে বিস্বাদ। সবচে উৎকৃষ্টমানের খাবার সবসময় যাদের সামনে পরিবেশিত হয়ে থাকে। মার্কেটের সবচেয়ে দামী দামী কাপড়গুলো যাদের আলমারীর শোভা বর্ধন করে। তারা জানে না কাকে বলে হাড় কাঁপানো শীত, আর কাকে বলে হাপানী উঠা গরম। মোটকথা পৃথিবীতে যাদের জন্মই হয় শুধু বিলাসিতা করার জন্য, দুঃখ-কষ্ট ও অনাহার-অনিদ্রা যাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করে না।

আর অপর পক্ষ হল হতভাগা দরিদ্র শ্রেণী, বাশের কঞ্চির ঝুপড়ী, শক্ত বালিশ ও তেলচিট- চিটে কাঁথার সঙ্গে যাদের পরিচয় ঘটে প্রথম চিত্কার থেকে। শুরুর দিন থেকেই যাদের পিছু নেয় ক্ষুধা আর অনাহারের যাতনা। যাদেও শৈশব কাটে মায়ের আঁচলের পিছু পিছু ধনিদের দুয়ারে ধর্ণা দিয়ে, কৈশর কাটে কাঠি হাতে সারা

দিন টায়ারের পিছে ছুটে, যৌবন অতিবাহিত হয় তিন চাকার উপর ভর করে, আর অবশেষে বার্ধক্য এসে উপস্থিত হয় এক রাশ রাহুর

সমাজের এ দুঃশ্রেণীর মানুষ আল্লাহ্ পাকই সৃষ্টি করেছেন। ধনিকে যেমন আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, গরীবের সৃষ্টিকর্তাও তেমনি আল্লাহ্। দারিদ্রতা যেমন আল্লাহ্ তায়ালার দেয়া, সচ্ছলতাও তেমনি আল্লাহ পাকের কৃপা। তীব্র গরমে এসির ঠাণ্ডা বাতাস যিনি সৃষ্টি করেছেন, প্রকৃতির নির্মল বাতাস ও খোলা প্রকৃতি তারই হাতে গড়া। সুতরাং এখানে ভাবার বিষয় হচ্ছে : পৃথিবীতে আল্লাহ এ দু’রকমের জীবন ব্যবস্থা কেন সৃষ্টি করেছেন! কেন তিনি মানুষের মাঝে ধনি-গরীবের এই পার্থক্যরেখা টেনে দিয়েছেন!!। আল্লাহ চাইলেই তো পারতেন সকল দুঃখ-কষ্ট উঠিয়ে নিয়ে সুখ ও সমৃদ্ধিতে এই ধরাকে ভরে দিতে। কিন্তু তিনি এমনটা না করে এই পৃথিবীর মানুষকে দু’ভাগে ভাগ করে সৃষ্টি করলেন কেন? নিশ্চয় এর মাঝে কুদরতে এলাহীর কোনো তত্ত্ব নিহিত রয়েছে। রয়েছে এর মাঝে কোনো অন্তর্ণহিত কারণ।। আল্লাহ্ যাদের সুখ ও সচ্ছলতা দান করেছেন,
তাদের একটু ভেবে দেখা দরকার যে আল্লাহ তায়ালা এ সম্প আমাকে কেন দান করলেন। সুখ তার আমকেই বা কেন বেছে নিলেন। অথচ আমার প্রতিবেশি লোকটা। তারও তো আমার মতো সেবা। দু’টো হাত, দু’টো পা, চোখ, কান সবই রয়েছে, তাকে কেন দিলেন না। তুলনামূলক দূর্বল হয়েও আমি গাড়ীর মালিকের আসনে বসা, অথচ আমার চেয়ে শক্ত-সামর্থ লোকটা ড্রাইভিং সিটে। এভাবে যখন আমি কেন ভাবব, তখন আমার সামনে আস্তে আস্তে স্পষ্ট হবে, আমার বুঝে আসবে যে এ সমস্ত কিছুই আমার আল্লাহ্ আমাকে একমাত্র আপন অনুগ্রহেই দান করেছেন। তিনি যদি আমার পরিবর্তে এসব অন্য কাউকে দিতেন তাহলে আমার কিছুই করার ছিল না। অতএব আল্লাহর দেয়া এই সম্পদ যথেচ্ছা খরচ করার অধিকার তিনি আমাকে দেননি। তা খরচ করার সঠিক পথ ও পন্থা নিশ্চয় তিনি রেখেছেন!

আমরা যদি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সেই সঠিক পথ ও পন্থার অনুসন্ধান কওে দেখি, তাহলে আমরা দেখতে পাব যে এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন অর্থঃ আর যারা তাদের সম্পদকে দিনে ও রাতে, গোপনে ও প্রকাশ্যে (আল্লাহর রাস্তায়) খরচ করে, দিকে তাদের প্রতিপালকের নিকট তাদের জন্য রয়েছে অফুরন্ত প্রতিদান। আর থাকবে না তাদের কোনো দুশ্চিন্তা বা ভয়।

আরেক জায়গায় তিনি ইরশাদ করেন- অর্থঃ আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করো! (আর তা এমনভাবে যে) তোমরা নিজেদের ক্ষতির সম্মুখীন না করে ফেল।

খিদমাতে খালক সৌভাগ্যের সোপান।

অপর দিকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র হাদীস শরীফে ইরশাদ করেন- অর্থঃ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- দু’টো বিষয় এমন আছে, যার সম্পর্কে হিংসা করা যায়। প্রথমত ঐ ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ্ পাক সম্পদ দান করেছেন এবং সে আল্লাহর দেয়া সম্পদ থেকে ন্যায় পথে খরচ করে…(বুখারী মুসলিম) এই হাদীস থেকে বুঝে আসে যে সম্পদ জমা করে রাখা নয়, বরং তা থেকে খরচ করাটাই ঈর্ষা করার মতো

। সঠিক য়গায় বা সঠিক স্থানে খরচ করাটা মূল উদ্দেশ্য। আর বর্তমান সময়ে সঠিক স্থানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান মতে খালক বা সৃষ্টির

বর্তমান সময়ে এর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু। এটা যদি যাচাই করা হয়, এর জন্য একটা উদাহরণই যথেষ্ট। আমরা যদি বাংলাদেশে খৃষ্টান মিশনারীদের অপাতৎপরতা সম্পর্কে একটু জানতে চেষ্টা করি, তাহলে দেখতে পাব যে তারা সুবিধাবঞ্চিত মানুষদেরকে শুধুমাত্র তাদের ধর্মে ধর্মান্তরিত করার জন্য প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। শুধু তাই নয়। এসমস্ত লোকদেরকে বিনা খরচে চিকিৎসা সেবা, ও স্কুল শিক্ষা দেবার জন্যে জায়গায় জায়গায় তারা হাসপাতা ও খ্রীষ্টান মিশনারী স্কুল প্রতিষ্ঠা করছে। যার দরুণ সুবিধাবঞ্চিত মানুষ বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষগুলো তাদের অসহায় শিকারে পরিণত হচ্ছে।

বাংলাদেশের মানুষদেরকে স্পর্শকাতর দিকটি সম্পর্কে যিনি সর্বপ্রথম সতর্ক করেন, তিনি হলেন মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরি রহ.। তিনি অনেক দরদের সঙ্গে তার সমস াময়িকদের এই খিদমতে খালকের আহ্বান করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমরা বরাবরের মতো তার এই আহ্বানের যথাযথ কদর করতে পারিনি। যার অনিবার্য ফল হিসেবে আমরা ময়দানের দখলদারিত্ব হারিয়ে ফেলেছি। তখন যদি আমরা তার এই দরদভরা ডাকে একটু সাড়া দিতাম, তার অস্থির হাতছানিতে কয়েক কদম এগিয়ে আসতাম, তাহলে হয়তোবা বর্তমান সমাজে আমাদের অবস্থান আরেকটু ভালো থাকত। কিন্তু হায়!… আমাদের এই চরম উদাসীনতার প্রতি আক্ষেপ করেই হয়তো জীবনের শেষ দিকে তিনি বলেছিলেন: তুম লোগোনে মুঝে পাঁহচানা নেহী।।

আমরা যদি আমাদের মূলের দিকে একটু দৃষ্টিপাত করি, আমরা ইসলাম যাদের কাছে পেয়েছি, যাদের হাত ধরে ইসলাম আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে। সেই আরবের লোকদের সম্পর্কে যদি আমরা একটু চিন্তা করি যে আল্লাহ পাক তৎকালীন পৃথিবীতে এত এত দেশ থাকা সত্ত্বেও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয়। আর খরচ করাটাও যেনতেন মহামানব, উভয় জাহানের সবচেয়ে

বড় নেয়ামত, আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসা ল্লামকে এই বিজন মরুর আরবেই কেন পাঠালেন? নবী সাহচর্যের সৌভাগ্যে মরুবাসীদেরই কেন সম্মানিত করলেন? অথচ সে সময়ে আরব নামে কোনো দেশ রয়েছে, এটাই সভ্য জগতের খুব একটা জানা ছিল না ।

এ বিষয়ে আমরা যদি একটু ঘাটাঘাটি করি, তাহলে দেখতে পাব সে সময় পুরো পৃথিবীর মানুষদের থেকে আরবের লোকেরা সবচেয়ে পিছিয়ে পরা জাতি ছিল ঠিক আছে! কিন্তু তাদের মাঝে এমন কিছু মহৎ গুণ ছিল, যা সমকালীন আর কোনো জাতির কাছে ছিল না। সে গুনগুলো ছিল: সত্যবাদীতা, অকপটতা, বীরত্ব, সাহসিকতা এবং অতিথিপরায়নতা। এই অতিথিপরায়নতা তাদের রক্তে মাংসে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে তারা এটি নিয়ে একে অন্যের ওপর গর্ব করত। এক সম্প্রদায় অপর সম্প্রদায়ের ওপর জাত্যাভিমান প্রকাশ করত। তাদের সেই অতিথিপরায়নতা আজো আরবদের মাঝে বিদ্যমান। তাই আল্লাহ্ সে সময় তাদেরকে যেমন আখেরী নবী দ্বারা মহিমান্বিত করেছেন এবং ইসলামের পরবর্তী যুগে অঢেল সম্পদ দারা সম্মানিত করেছেন, বর্তমান সময়েও এই গুণের দরুন তাদের পায়ের নিচে তরল সোনা প্রবাহিত করে দিয়েছেন। উন্নত বিশ্বের সভ্যতাকে আরবদের হাতে জিম্মি করে রেখেছেন। এই খেদমতে খালকের নজীর এই নিকট অতীতেও আমরা দেখতে পাই হযরত হুসাইন আহমদ মাদানীর কাছে। তার সুবিশাল দস্তরখ – ানের কথা তো সর্বজনবিদিত। যখন এই দস্তরখানের আমল চলত তখন তিনি আরব কবির একটি কবিতা সবসময় আবৃত্তি করতেন: (অর্থাৎ : “আমার মেহমান যতক্ষণ পর্যন্ত আমার কাছে থাকবে ততক্ষণ আমি তার গোলাম, এটা ছাড়া আমার আর একটা আচরণও এমন পাবে না, যা গোলামের আচরনের সাথে খাপ খায়”)।

আমরা যদি আমাদের দেশে এই খিদমতে খালকের সুফল দেখতে চাই তাহলে আমরা দেখব যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মেহমান নাওয়াজ মানুষ হল চট্টগ্রামের মানুষ। পরোপোকারের ক্ষেত্রে সবার আগে এগিয়ে আসে এই এলাকার মানুষজন। অপর দিকে সামগ্রিক বিচারে যদি আপনি দেখতে চান বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনি লোকগুলো কোন অঞ্চলে? তাহলের দেখবেন” সামগ্রিক” দিক থেকে চট্টগ্রামের নামই আগে উঠে আসবে। আর তাদের মাঝে এই গুণটা এসেছে সমুদ্র হয়ে আরবদের মাধ্যমেই। আমরা যদি আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র সীরাত অধ্যায়ন করি, তাহলে দেখতে পাব যে তাঁর পুরোটা জীবনই ছিল খেদমতে খালকের মহিমায় ভাস্বর। সেখান থেকে ছোট একটা দৃষ্টান্ত এখানে তুলে ধরছি। সর্বপ্রথম ওহি নাজিল হওয়ার পর যখন আল্লাহর রাসূল ভয়ে কম্পমান অবস্থায় আম্মাজান হযরত খাদিজাতুল কুবরা রা.-এর নিকট এসে তাঁর দুশ্চিন্তার কথা বললেন। তখন হযরত খাদিজা সান্ত্বনার স্বরে বললেন, আল্লাহ কখনো আপনার অনিষ্ট করতে পারেন না। কারণ আপনি তো অসহায়কে সাহায্য করেন, অন্যের বোঝা বহন করেন, ক্ষুধার্তকে আহার দান করেন। সুতরাং কোনো অনিষ্ট আপনাকে স্পর্শ করতে পাওে না। কী পরিমান অগাধ আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে তিনি বললেন যে, যার ভেতরটা খেদমতে খালকের মহিমায় ভরপুর তাকে কোনো অনিষ্ট পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারে না। আমরা যদি নববী সিরাতের এই অংশটুকু নিজের মাঝে ধারণ করে এই পথে একটু এগিয়ে আসি, তাহলে দেখতে পার স্বপ্নহীন বসে যাওয়া চোখগুলো স্বপ্ন দেখার শক্তি পাচ্ছে, নিরাশায় অন্ধকার মুখগুলো আশায় কেমন ঝিকমিক করছে এবং শুকিয়ে যাওয়া আখিযুগল থেকে কৃতজ্ঞতার শিশির করছে। যে শিশিরগুলো কঠিন হাশরের মাঠে হতে পারে আমার জন্য অনেক বড় পাথেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *