হজের আগে ও পরে

লেখকঃ মাওলানা আবরারুজ্জামান

হজের মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। অনেকে চলে গেছেন আবার অনেকে যাবেন, আবার অনেকে যাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে এখলাছের সাথে হজের আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন। রাসুলে কারিম সা. বলেন: হজ্জে মাবরুর এর পুরুস্কার একটাই, আর তা হল জান্নাত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হজ্জে মাবরুর নসীব করুন, আমিন।

যে বিষয়টা আমার খুব যেহেনে আসছে, সেটা হল আমাদের হজের ক্ষেত্রে আমরা মনে করি যে মক্কা শরীফ যাওয়ার পরে, বিশেষ করে জিলহজ্ব মাসের আট তারিখ থেকে বার তারিখ পর্যন্ত, এই পাঁচ দিন হল হজের দিন। আর বাকি আগে পরে যে দিনগুলো আছে সেগুলো হজের দিনের অংশ না। আমাদের সাধারণত এমন একটা ধারণা থাকে। এজন্য যখন আমরা হজ শিখি, হজের আমলগুলো আয়ত্ত করার চেষ্টা করি তখন এই পাঁচটা দিনের আমল খুব ভালোভাবে শিখি। এটা তো শিখতেই হবে, তবে এটাও আমাদের মনে রাখতেই হবে, সেটা হল: হজ্জে মাবরুরের জন্য এই পাঁচ দিনের পাশাপাশি আরো কিছু আমল আছে। যেগুলো শুরু হয়ে যায় আমাদের দেশে থাকতেই। হজ আসলে শুরু হয়ে

যায় নিয়ত করার প্রথম দিন থেকেই। যেই আমলগুলো করলে হজ্জে মাবরুর কবুল হবে বলে আশা করা যায় সেই কাজগুলো শুরু হয়ে যায় হজের নিয়ত করার সাথে সাথেই। তখন থেকে সতর্ক হয়ে যাওয়া, তখন থেকে নিজেকে পুরাপুরি আল্লাহমুখি করা উচিত এবং এমন কোনো কাজ না করা উচিত যে কাজগুলোর কারনে হচ্ছে মাবরুর আল্লাহর কাছে কবুল হয় না। হজ কবুল না হওয়াটা মক্কা শরীফের কোনো আমলের কারনে নয়; বরং সেটা আমাদের দেশের আমলের কারনেই হতে পারে। যেমন আমি হজের টিকা দেওয়ার জন্য গেলাম এক হাসপাতালে, সেখানে গিয়ে দেখলাম যে অনেক মানুষ লাইনে দাঁড়ানে T। সবাই বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য লাইনে দাঁড়ানো। এখানে যুবক ওখানে বৃদ্ধ, বিভিন্ন বয়সের মানুষ আছে, এর মধ্যে দেখা গেল যে এক ভাই সমস্ত লাইনকে ডিঙ্গিয়ে আরেকটা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেছে। কেন? পরে জানা গেল যে সে হজে যাবে, হজে যাওয়ার জন্য টিকা দিবে, তাই আগেই তার কাজ সারার জন্য লাইনের মানুষের হক নষ্ট করেছে। হজটা কিন্তু মাবরুর হচ্ছে না। হয়তো অনেক মাসআলা মাসায়েল মুখস্ত করেছে এবং হজের পাঁচটা দিন খালেছ নির্ভেজাল হজ দীর্ঘক্ষণ মোনাজাত করেন। দৈনিক কমছে কম একটা তাওয়াফ করেন, খুব এতমিনানের সাথে। সুবিধামতো এক জায়গায় বসে দোয়া করেন। আমি হযরতের বসার কাইফিয়্যত খেয়াল করেছি। আমরা তো স্বাভাবিক ভাবে দোয়া করি নামাযের ছুরতে বসে। হযরতকে দেখলাম দোয়ার জন্য বসেছেন আসন দিয়ে খুব রিলাক্সে। এটা একটু খটকা লাগলো যে মোন জাতের আদব হল নামাযের ছুরতে বসা। আমার যেহেনে আসল যে দীর্ঘ সময় অনেকে বসতে পারে না। নামাযের ছুরতে বসে থাকলে হাঁটু ব্যথা হয়ে যায়, হাঁটু সামাল দিতে গিয়ে মোনাজাতে মন বসে না। দীর্ঘ সময় আল্লাহর বান্দা এত কান্নাকাটি করছেন, এমন পানি পড়ছে চোখ দিয়ে, এমন ভাবে আল্লাহর কাছে চাচ্ছেন যে দুনিয়ার মধ্যে এই মানুষটার চেয়ে ফকির মিসকিন আর কেউ নাই। আল্লাহর ঘরে আমরা যাব সময় নষ্ট না করি। আল্লাহর কাছে আমাদের অনেক কিছু চাওয়ার আছে। আল্লাহর ঘরের কাছে গিয়ে আল্লাহর কাছে চাইতে পারিনি এর থেকে বদবখতি আর কিছু নাই। আল্লাহর ঘরের কাছে গিয়ে বাহির দিকে মন দিয়ে দেখলাম। সামনে কাবা আর আমার নজর জমজম টাওয়ারের দিকে। আল্লাহ তাআলা এগুলো পছন্দ করেন না। জমজম টাওয়ারের তলা গোনার জন্য কেন যাওয়ার দরকার? আল্লাহর ঘরের কাছে মক্কা শরীফের মার্কেটগুলো কেমন, এটা দেখার জন্য কেন যাওয়া লাগে আল্লাহর ঘরের সামনে? সেখানে শুধু আল্লাহর ঘরকে নিয়ে কল্পনা করি। আল্লাহর ঘরে যাব আমি শুধু কল্পনা করব যে এখানে আল্লাহর একটা ঘর কালো গিলাফে ঢাকা আর চারপাশে মসজিদ।

মসজিদে হারাম, আর কিছুই নাই। তখন দেখবেন নামাযে মোন াজাতে কী স্বাদ আসে। আল্লাহর কাছে কাঁদতে থাকি; লজ্জা না পাই। দোয়ার প্রতি লজ্জা পাওয়া এটা অহংকারির আলামত । দোয়া করতেছি আমাকে কে না কে দেখতেছে, আরে আমি তো ফকির আমাকে দেখলে কী আর না দেখলে কী। কোন ফকির ভিক্ষা করতে লজ্জা পায়? আর আমি তো সবচেয়ে বড় ফকির, আমি কেন লজ্জা পাব? আর লজ্জা কিসের এখানে? মোনাজাত করতে থাকব, চাইতে থাকব। কোটি কোটি মানুষ আমাকে দেখুক তাতে আমার কী? আমি তো মানুষ দেখি না, আমি তো শুধু আল্লাহকে দেখি। এই অনুভূতি নিয়ে হজের সময়গুলো আমরা কাজে লাগাব। মিনার ময়দানে শুধু মোনাজাত করব। আল্লাহর দরবারে চারদিকে সবাই গল্পগুজব করুক, আমি মোনাজাত করতে থাকব। আমার এই কাইফিয়্যতে আস্তে আস্তে আশপাশের মানুষগুলো পরিবর্তন হয়ে যাবে। নিরবতা নেমে আসবে ময়দানে। প্রথম প্রথম ওয়াসওয়াসা আসবে। হযরত মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরি রহ.-এর নিকট কেউ একজন এই অভিযোগ করল- আমি নামাযে দাঁড়ালে রিয়া আসে, মোনাজাত করলে রিয়া আসে। হুজুর বলেন, এটা রিয়া না, এটা রিয়ার ওয়াসওয়াসা। রিয়ার ওয়াসওয়াসা গুনাহ নয়, এটা শয়তান দেয়। আমল থেকে সরানোর জন্য। এই রিয়া বেশি বেশি করতে থাক, করতে করতে বিয়েটা চলে যাবে আমলটা থেকে যাবে ।পাহাড়পুরী হুজুর রহ. বলেন যে, এটা বেশি বেশি করতে থাক। যে জিনিস করতে গেলেই রিয়ার ভাব আসে সেটা আরো বেশি বেশি করতে থাক। আমরা আল্লাহর জন্য করতেছি ভাব একটা আসতেছে, করতে করতে এক সময় ভাবটা থাকবে না আমলটা থেকে যাবে। এজন্য বোকামি না করি যে আহারে আমার পাশে বন্ধু বসা আমি যদি কান্না করি কেমন দেখা যায়। কিছু ব্যাপারে স্বার্থপর হতে হয়। আমি ফকির, আমি ভিক্ষা করব আল্লাহর কাছে। এই অনুভূতি নিয়ে আল্লাহর কাছে চাইতে হবে। আল্লাহর ঘরের সামনে কোনো একটা নীরব জায়গা দেখে দু’রাকাত বা চার রাকাত নামায পড়ব এবং আশপাশের সব ভুলে নজরের হেফাজত করতে হবে। মাথা নিচু করে আল্লাহর ঘরের দিকে চলে যাব, আশপাশে কিছুই দেখব না। সেই জামানার কথা কল্পনা করব, যেই জামানায় কিছুই ছিল না। হাফেজ্জী হুজুর রহ. মক্কাথেকে মদিনায় আসা যাওয়া করছেন, পাশে পাহাড়পুরি হুজুর রহ. বসা।

হাফেজ্জী হুজুর রহ. পাহাড় গুলো দেখতেছেন আর কাঁদতেছেন হযরত আপনি কাঁদেন কেন, হাফেজ্জী হুজুর রহ. মাঝে মধ্যে একটু বিব্রত হতেন। কান্নাকাটি করতেন আল্লাহর জন্য। আশপাশে কেউ দেখে ফেলছে এমন ভাব আসত না। একটু বিব্রত হয়ে বলতেন- তুমি দেখে ফেলেছ। আমি এজন্য কান্না করতেছি, আমার একটা কথা মনে পড়েছে, এই যে পাহাড়, ঠিক এই পাহাড়টার এই জায়গাটার মধ্যে যেখানে আমার নজর আজকে পড়েছে। এক সময় হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর নজর ঠিক এই জায়গায় পড়েছিল। একই জায়গায় মুহাম্মাদ সা.-এর নজর আর আমার নজর পড়েছে, মাঝখানে ১৪০০ বছর ব্যবধান। ঐ পাহাড়টার ঐ জায়গা একটুও ক্ষয় হয়নি। কাবা শরীফ; এটা তো ঐ ঘর ঠিক যে ঘরের প্রতি রাসুলে কারীম সা.-এর নজর পড়েছে। এই অনুভূতিটা যদি আমার মধ্যে থাকে সেটা হবে হজ্ব। মোনাজাতের কথা বারবার বলি । আল্লাহর ঘরে ৪০দিন বা ৫০দিন, যে কয়দিন থাকি। আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি ছাড়া আর কিছু করব না। আল্লাহর কাছে কী চাইব। হাফেজ্জী হুজুর রহ. তাওয়াফ করেন তো পাহাড়পুরি হুজুর রহ. জিজ্ঞাসা করেন যে, হযরত আমরা তো তাওয়াফের সময় নিজের কাছে কোনো কিতাব রাখি। কিতাব পড়তে থাকি আর তাওয়াফ করতে থাকি। কিন্তু আপনার কাছে তো কিছু দেখি না আপনি কী করেন । হাফেজ্জী হুজুর রহ. বললেন যে, সাত চক্করে আমি মোন জাতে মাকবুলের সাত মনজিল পড়তে থাকি ।আপনারা কিতাব দেখে পড়েন আমি মুখস্থ পড়ি। পাহাড়পুরি হুজুর রহ. নিজ শ্বশুরকে প্রশ্ন করলেন, আপনি কি এটা মুখস্থ করেছেন? হাফেজ্জী হুজুর রহ. বললেন, না, আমি পড়তে পড়তে মুখস্থ হয়ে গেছে। মোনাজাতে মাকবুলের দোয়ার কথা এজন্য বললাম যে, মোনাজাতে মাকবুলের দোয়াগুলো জামে দোয়া। হযরত মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব দা.বা. বলেন, আল্লাহ তায়াআলার কাছে খাছ দোয়া আর আম দোয়ার কোন পার্থক্য নাই। দোয়ার ব্যাপারে আমরা এই বিষয়টা খেয়াল রাখব যে, রাসুলে কারীম সা.-এর শেখানো যে দোয়াগুলো আছে সেগুলো বেশি বেশি আমল করব। হজের সফরে আমরা যাচ্ছি, আমরা ব্যাপক দোয়া করব।

রাসুলে কারীম সা.-এর রওজায় সালাম পেশ করার ক্ষেত্রে অনেকে মুহাব্বতে সালাম পাঠায়, সেখানে কারো নাম বলে সালাম পেশ করার দরকার নাই । শুধু এতটুকু বলা যে সারা উম্মতের পক্ষ থেকে আপনাকে সালাম। আমরা দোয়া বেশি বেশি করব। দোয়া ছাড়া আল্লাহর ওলী হওয়া যায় না। সর্বশেষ একটা কথা বলি, অনেক কিছু করলাম, চোখের পানিও ফেলা হল, অনেক দোয়াও করা হল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার কাছে কোনে াটাই কবুল হবে না যদি আমার এই সব কিছুর পিছনে হারাম উপার্জন থাকে। সেদিন এক ভাই আসল। অনেক দোয়া চাইলেন কিছু হাদিয়াও দিলেন। আশপাশে মানুষ ছিল তাই কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস ফিস করে প্রশ্ন করলাম- ভাই! কিছু মনে করবেন না। আপনাকে একটা প্রশ্ন করি, আপনার কি সুদি লোন আছে? নাকি সুদে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন। তিনি বললেন- এটা বাধ্য হয়ে করেছি। আমি বললাম এটা বাদ দিতে হবে। থানভী রহ. বলেন- হাশরের ময়দানে অনেকের আমলের হিসাবে মিলবে না। বলবে যে এত আমল করলাম কিছুই দেখছি না। আবার তেমন কিছুই করলাম না এত কিছু আমার আমল নামায়? হিসাব উলট পালট হয়ে যাবে। এর একটা কারণ হলো, যে সুদের উপর লোন নেওয়া। আমাদের জিন্দেগির সব ঠিক আছে; নামায, রোযা, হজ, যাকাত, আমল আখলাক, সব ঠিক আছে। কিন্তু কোন শক্তি দিয়ে আমি এই কাজগুলো করলাম। বাহ্যিকভাবে সব ঠিক থাকবে। কিন্তু আস্তে আস্তে সব ছুটে যাবে। হজ করে আসতে আসতে হজ নাই হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সব ইবাদতের আগে হালাল খাওয়ার এবং ভালো কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। হালাল খাওয়ার নতিজাই হল আমলে ছালেহ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে বার বার আল্লাহর ঘরে যাওয়ার তাওফিক দান করুন আমিন।

1 thought on “হজের আগে ও পরে”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *