হালাল উপার্জন পন্থা ও আবশ্যিকতা

লেখকঃশামসুল আরেফীন

জীবন ধারণের জন্য অর্থ সম্পদের প্রয়োজ নীয়তা অনস্বীকার্য । কিন্তু এটিই জীবনের মূল লক্ষ্যবস্তু নয়; বরং উপলক্ষ মাত্র। পথিক মাত্রেরই পাথেয় সংগ্রহ করতে হয় । তা সংরক্ষণও করতে হয় অতি যত্নে । তাই বলে পাথেয় সংগ্রহ করাই কোনো পথিকের উদ্দেশ্য হতে পারে না। অর্থ সম্পদ উপার্জে নর ক্ষেত্রে ইসলামের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই; বরং ইসলাম এ ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা হয়েছে – تفلحون لعلكم كثيرا واذكروالله الله فضل

وابتغوامن الأرض في فانتشروا الصلاة قضيت فإذا

যখন নামাজ শেষ হয়ে যাবে তোমরা পৃথিবী= তে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর দেয়া অনুগ্রহ তথা রিযিক অন্বেষণ কর। আর আল্লাহকে স্বরণ রেখ যেন তোমরা সফল হতে পার। -জুমুআ ঃ ১০

তবে এ সম্পদ আহরণের পদ্ধতির ক্ষেত্রে বৈধাবৈধের একটি প্রভেদরেখা টেনে দিয়েছে ইসলাম। পূর্বোক্ত আয়াতের শেষাংশে পরোক্ষভাবে সেদিকেই ইঙ্গিত রয়েছে। অন্যত্রে আরো স্পষ্টভাবে এ বিধান বর্ণিত হয়েছে।.

مبين عدو لكم إنه الشيطان خطوات ولاتتبعوا طيبا خلالأ الأرض في مما – كلوا الناس ياأيها

হে লোক সকল! পৃথিবীতে হালাল যা কিছু আছে তোমরা তা থেকে ভক্ষণ কর আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। বাকারা : ১৬৮ কথা হল, হালাল মানেই তা কি গ্রহণযোগ্য?

যেমন খুশি যেভাবে খুশি তা আহরণ করা

যাবে? নাকি এজন্য বিধিবদ্ধ কোনো নিয়ম

নীতি আছে? এর সমাধানে মহা গ্রন্থ আল এরআনে ঘোষণা হয়েছে, تعلمون وأنتم بالائم الناس أموال من لتأكلوا الحكام إلى بها وتدلوا بالباطل

بينكم أموالكم ولاتأكلوا তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। এবং মানুষের ধন সম্পদের কিয়দাংশ জেনে শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারে কর নিকট পেশ কর না। -বাকারা : ১৮৮ কুরআনের বর্ণনাশৈলী অনুযায়ী ছোট্ট এ আয়াতটিতে অতি সংক্ষেপে সম্পদ উপার্জনে নর বিধান চমৎকাররূপে বিবৃত হয়েছে। আয়াতের ভাষ্য হল, সম্পদ যত উত্তম আর পবিত্রই হোক না কেন যদি তা অর্জনের পদ্ধতি বৈধ না হয়ে থাকে ইসলাম কখনোই তা গ্রহণের অনুমতি দেয় না।

হালাল উপার্জনের পথ যত বন্ধুর হোক না কেন অধিক সম্পদের আশায় অন্যয় পথ অবলম্বন করে কখনোই তা পরিত্যাগ করা উচিত নয়। সামাজিক স্ট্যাটাস আর ব্যক্তিগত ‘ইগো’ এর কারণে অনেক সময়ই আমরা উপার্জনের হালাল ও বৈধ পথগুলো শুধু এ কারণে বর্জন করি যে সেটা আমাদের ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না। ফলে আমাদের সমাজে বেকারের সংখ্যা দিন দিনই বাড়ছে। বিবিএস এর তথ্যমতে বর্তমানে আমাদের দেশে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা চার কোটি ৮২ লক্ষ।

বলে জীবিকা নির্বাহের কোনো পন্থাকে তুচ্ছজ্ঞান করেননি। হযরত দাউদ আ. ছিলেন কর্মকার। হযরত ইদরীস আ. দরজির কাজ করে নিজের জীবিকা নির্বাহ করতেন। হযরত নূহ আ. ছিলেন সুতার আর বিশ্বনবী সাল্লালাহ আলইহি ওয়াসাল্লাম হালাল রিমিক উপার্জনের জন্য মক্কাবাসীর বকরির রাখালি করেছেন। অন্যের ব্যবসা দেখাশোনা করেছেন। দেশ দেশান্তরে বাণিজ্য করেছিলেন। এটা লাঞ্ছনা কিংবা অপমানজনক কোনো বিষয় নয়

অপমানকর তো হল, অন্যকে ঠকিয়ে অন্যায়ভাবে অবৈধ অর্থ উপার্জন করা। অন্যকে প্রতারিত করে কালো টাকার পাহড় গড়া মানুষের বিশ্বাস ভেঙ্গে চুরমার করে নিজের পকেট ভরা। একদিন নবী আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হল- হে আল্লাহর রাসুল! জীবিকা -বায়হাকি উপার্জনের জন্য সবচে’ উত্তম কর্ম কী ? তিনি বলেছিলেন

لابتغى ثالثا ولايملا جوف ابن آدم

عمل الرجل بيده، وكل بيع مبرور নিজ হাতে উপার্জন ও ধোঁকা প্রতারণা মুক্ত ব্যবসা। -বাযযার উপার্জনে হালাল পন্থা অবলম্বন কেবল

জীবিকা অন্বেষণের একটি মাধ্যম নয়; বরং এটি একটি ইবাদতও বটে। বান্দা এর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হয়। তার আমলনামায় জমতে থাকে রাশি রাশি আজর ও সাওয়াব নবী আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসা- একদিন সাহাবিদের সাথে মসজিদে নববীতে বসেছিলেন। এমন সময় সুঠামদেহি অন্য এক সাহাবি তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। উপস্থিত সাহাবিরা তাকে দেখে বললেন ‘আহা! এ ব্যক্তি যদি আল্লাহর রাস্তায় বের হত কতই না উত্তম হত।’ নবীজী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে বলেন ‘যদি সে তার ঘরে থাকা ছোট ছোট সন্তানদের জন্য হালাল উপার্জনে বের হয়ে থাকে তবে সে আল্লাহর রাস্তায় আছে। যদি বয়োবৃদ্ধ মা-বাবার জীবিকা নির্বাহের জন্য বের হয়ে থাকে তবে সে আল্লাহর রাস্তায় আছে। যদি সে নিজের জীবিকা অন্বেষণে ও হালাল উপার্জনের জন্যও বের হয়ে থাকে তবুও সে আল্লাহর রাস্তায় আছে।

পার্থিব সুখ সমৃদ্ধি আর একটু উন্নত জীবন যাপনের আশায় মানুষ সাধারণত অন্যায় পথে পা বাড়ায়। মানুষ মনে করে অর্থ সম্পদের প্রাচুর্যই তাকে সুখ স্বাচ্ছন্দ এনে দেবে। কিন্তু মুমিন হিসেবে আমাদের বিশ্বাস সুখ স্বাচ্ছন্দ আল্লাহর আনুগত্যের মাঝেই নিহিত। ফেব্রুয়ারী ‘২০ ইং

অন্যায় পথে অর্জিত সম্পদ স্বাচ্ছন্দের বাহ্যিক উপকরণগুলোর যোগান দিতে পারলেও প্রকৃত সুখের সন্ধান দিতে পারে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এ সম্পদই অশান্তির উৎস হয়ে দাঁড়ায়। সম্পদের প্রতি মানুষের লোভের বিষয়টি নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াস স্লোম এর ভাষায় অত্যন্ত স্পষ্টরূপে উঠে এসেছে। হযরত আনাস রা. বর্ণনা করেন নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসা স্লাম বলেছেন لو كان لابن آدم واديان من مال

إلا التراب যদি কোনো মানুষের দুই উপত্যকা ভর্তি সম্পদ থাকে তাহলে সে এর অনুরূপ আরেক উপত্যকার আকাঙ্খা করে। প্রকৃতপক্ষে কেবল কবরের মাটিই পারে বনু আদমের উদর পূর্তি করতে।

অনেক সময় আক্ষেপে পরেও মানুষ উপার্জনের উদ্দেশ্যে অন্যায় পথে পা বাড়ায়। চোখের সামনেই যখন পাশের ফ্লাটের প্রতিবেশী ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে বেরোয় মাসে তিনবার শপিং করে। চাওয়ার আগেই বাচ্চাদের বাড়তি চাহিদা পূরণ করে। তার মতো আমি কেন পারব না’ এ মন্ত্র যপতে যপতে মাথায় তুলে নেয় পরিবারের মেকি চাহিদাগুলোর ভার নবী আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এভাবে সান্ত্বনা দিয়েছেন।

إذا نظر أحدكم إلى متفضل عليه في المال والخلق فلينظر إلى أسفل منه ধনে জনে তোমাদের চেয়ে সমৃদ্ধ কারো প্রতি যদি তোমাদের কারো দৃষ্টি পড়ে তাহলে সে যেন তার চেয়ে নিচের স্তরের ব্যক্তিকে নিয়ে ভাবে। -বুখারি হাদিসের শিক্ষা স্পষ্ট, তোমার চেয়ে ধনী সম্পদশালী কাউকে দেখে তার মতো হবার আশায় নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না। কারণ আজ তুমি সম্পদে যার অনুরূপ হতে চাও আগামী দিনে তুমি তার চেয়েও বড় কারো মতন হতে চাইবে। এবং এভাবে সম্পদের আশা আর লোভে তোমার জীবন *আরো চাই আরো চাই’ এর হাহাকারে জর্জরিত হয়ে যাবে। তাই বরং যে তোমার চেয়ে কম সম্পদের মালিক তাকে দেখ প্রশান্তি পাবে, আল্লাহর শুকরিয়ায় হৃদয় ভরে উঠবে। অন্য এক হাদিসে নবীজী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অল্পেভূষ্টিকে সফলতা বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইরশাদ হয়েছে। قد أفلح من أسلم ورزق

 

كفافا قنعه الله بما أتاه যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহন করেছে এবং আল্লাহ তাকে প্রয়োজনীয় রিযিক দান করেছেন আর সে তাতে সন্তুষ্ট সে সফলকাম। -মুসলিম

আসল কথা কি, রিযিক আল্লাহর পক্ষ থেকে বন্টিত ও নিয়ন্ত্রিত। তিনি যাকে যতটুকু রিযিক দিতে চান সে ততটুকুর বাইরে সামান্যও ভোগ করতে পারে না এবং পারবে না। আর বণ্টিত রিযিক থেকে বঞ্চিত হবার কোনো আশঙ্কাই নেই। কারণ রিযিক বান্দাকে তার মৃত্যুর মতো খুঁজতে থাকে। মৃত্যু থেকে বাঁচতে সে যত সুরক্ষিত ও শক্তিশালী নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে থাকুক না কেন অবশেষে মৃত্যু তাকে পেয়েই বসে। রিযিকের ব্যাপারটিও তেমনি। বিষয়টি হাদিসে পাকে এভাবে বর্ণিত হয়েছে:

ان الرزق ليطلب العبد كما يطلبه اجله রিজিক বান্দাকে তার মৃত্যুর মতোই

খুঁজে ফেরে । -বায়হাকি আমরা উপার্জন বিমুখ হয়ে বৈরাগ্য বরণের কথা বলছি না। বলছি শুধু, রিযিক যার দেয়া, তার বাতলে দেয়া পদ্ধতি অনুযায়ী অন্বেষণ করলে বঞ্চিত হবার আশংকা যেহেতু নেই তাহলে হালাল হারামের তোয়াক্কা না করে জীবিকা নির্বাহের নামে সম্পদের পাহাড় গড়তে শুধু শুধু কেন আদাজল খেয়ে নেমে পড়তে হবে। একজন মুমিন হিসেবে প্রকৃত হারাম তো বটেই সম্ভাব্য হারাম থেকেও আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসা ল্লাম তার পবিত্র যিন্দেগিতে আমাদের জন্য এ শিক্ষাই রেখে গেছেন। ক্ষুধা কাতর অবস্থায় একদিন নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করেন। বিছানার উপর একটি খেজুর দেখে তিনি সেটি হাতে নিলেন। কিন্তু মুখে দিতে গিয়েও থেমে গেলেন। আম্মাজান আয়েশা রা:কে বলেন, আয়েশা! সদকার খেজুর হবার আশংকা না থাকলে আমি এটি খেয়ে নিতাম।

বলাবাহুল্য, নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার বংশধরদের জন্য সদকা গ্রহণ করা শরীয়ত সম্মত নয়। আর সে সময় যেহেতু তাঁর ঘরে সদকার সম্পদ একত্র করা হত। তাই সদকা খেজুর হতে পারে কেবল এ সন্দেহের কারণে তিনি ক্ষুধিত থাকা সত্ত্বেও সেদিন খেজুরটি ভক্ষণ করেননি। আল্লাহ আমাদের শিক্ষা গ্রহণের তাওফিক দান করুন। আমীন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *